পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারে জুড়ে দেওয়া হয় বিশেষ শর্ত: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে টেন্ডারে জুড়ে দেওয়া হয় বিশেষ শর্ত: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

জাতীয় ডেস্ক

সরকারি কেনাকাটায় পছন্দের কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দিতে দরপত্রে (টেন্ডার) কৌশলে বিশেষ শর্ত জুড়ে দেওয়ার গুরুতর অনিয়ম হচ্ছে বলে স্বীকার করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াৎ হোসেন। এ ধরনের অনিয়ম বাস্তবে ঘটে এবং অডিট কার্যাবলীতে প্রায়শই এসব কারচুপি ধরা পড়ে বলে উল্লেখ করেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্য খাত থেকে দুর্নীতি নির্মূল ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার বিশাল ঘাটতি নিরসনে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।

বুধবার রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে ‘বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য-ব্যবস্থার ঘাটতি নিরসন: সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার উপযোগী সেবা নিশ্চিত করতে ব্যয়দক্ষতার একটি দ্রুত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক মূল্যায়ন’ শীর্ষক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন কর্মশালায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের উদ্যোগে পরিচালিত এই গবেষণা কার্যক্রমটি পরিচালনা করে বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি)।

কর্মশালায় সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতার বিষয়টি বিস্তারিত তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজের সাম্প্রতিক একটি অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করেন। তিনি জানান, মন্ত্রণালয়ের একটি নথিতে অনিয়মের সন্দেহ হওয়ায় তিনি এক সপ্তাহ তা স্বাক্ষরহীন রাখেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যা চান। সন্তোষজনক জবাব না পেয়ে বাধ্য হয়ে সই করলেও পরবর্তীতে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন দরদাতা রিভিউ বোর্ডে আপিল করলে আগের সিদ্ধান্ত বাতিল হয় এবং সঠিক প্রতিষ্ঠানই কাজ পায়। এর মাধ্যমে তাঁর প্রাথমিক সন্দেহ প্রমাণিত হয়। অতীতে পরিকল্পনাহীন কেনাকাটার মাধ্যমে জনগণের বিপুল অর্থের অপচয়ের উদাহরণ দিয়ে মন্ত্রী জানান, তৎকালীন সরকারের আমলে ১১ কোটি টাকার দুটি রেডিওথেরাপি মেশিন ১৮ কোটি টাকায় কেনা হলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো বা বাংকার নির্মাণ না করায় খুলনা ও ফরিদপুরে যন্ত্রগুলো অব্যবহৃত পড়ে আছে।

একই অনুষ্ঠানে সরকারি ক্রয়বিধি মেনে কাজ করার পরও অডিটরকে পাঁচ শতাংশ কমিশন দিতে হয় বলে অভিযোগ তোলেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা। তবে এ অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্ত্রী স্পষ্টভাবে জানান, সততা ও সঠিক নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করলে কোনো ঘুষ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। কেউ অর্থ দাবি করলে সরাসরি তাঁকে অবহিত করার পরামর্শ দেন তিনি।

কর্মশালায় ৯ মাস ধরে দেশের আটটি বিভাগের ২২টি সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে পরিচালিত পিপিআরসির ওই গবেষণার বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন সংস্থাটির চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান। ৯৫টি গভীর সাক্ষাৎকার, জ্ঞান-দৃষ্টিভঙ্গি-চর্চা (কেএপি) জরিপ এবং ১৮টি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নথি পর্যালোচনার ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুতকৃত এই প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত অর্থবছরে হাসপাতালগুলোর গড় বাজেট ব্যয়ের হার ৮৫ শতাংশ হলেও ৯৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেই বছর শেষে অর্থ অব্যয়িত থেকে গেছে। বাজেট বাস্তবায়নে প্রশাসনিক জটিলতা, অডিট আপত্তির ভয়, বাজেট ব্যবস্থাপনায় চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণের অভাব এবং বরাদ্দ পুনর্বণ্টনে দীর্ঘসূত্রতাকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

গবেষণায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় ও জরুরি ওষুধের ব্যাপক ঘাটতির চিত্র ফুটে উঠেছে। তথ্য মতে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা মাত্র ২২ দশমিক ৭ শতাংশ, জেলা হাসপাতালে ২৩ দশমিক ৯ শতাংশ এবং বিশেষায়িত মেডিকেলগুলোতে তা মাত্র ১১ দশমিক ৫ শতাংশ। বর্তমানে সরকারি হাসপাতালের প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রায় ৬২ শতাংশ সরবরাহ করে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)। প্রতিষ্ঠানটি সময়মতো ও চাহিদানুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারলে এই সংকট বহুলাংশে সমাধান সম্ভব।

ওষুধের ঘাটতির পাশাপাশি সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে ডায়াগনস্টিক সেবার অবস্থাও নাজুক। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রয়োজনীয় রিএজেন্টের অভাব (৪৩ শতাংশ), অকেজো যন্ত্রপাতি (৩৪ শতাংশ) এবং প্রশিক্ষিত মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের সংকটের (১৯ শতাংশ) কারণে সাধারণ রোগীরা কাক্সিক্ষত ডায়াগনস্টিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশেষ করে স্বাস্থ্য বিভাগের অধীন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের ৬ হাজার ৪০৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে প্রায় ৪০ শতাংশ পদই এখন শূন্য।

সার্বিক পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, স্বাস্থ্য খাতে কেবল কত টাকা বাজেট বরাদ্দ করা হলো বা ব্যয় হলো, তা দিয়ে উন্নয়নের সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব নয়। সময়মতো অর্থছাড়, বরাদ্দকৃত অর্থের দুর্নীতিমুক্ত ব্যবহার এবং সাধারণ মানুষের হাতে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সচল যন্ত্রপাতির মাধ্যমে চিকিৎসা পৌঁছানোই স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল মাপকাঠি হওয়া উচিত।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ