অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা এবং এই খাতে পর্যাপ্ত দক্ষ জনবল তৈরি করার লক্ষ্যে বগুড়ায় একটি অত্যাধুনিক পাইলট ট্রেনিং একাডেমি প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক আকাশপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বহরে ২১টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার বড় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এভিয়েশন খাতের আধুনিকায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির এই সমন্বিত উদ্যোগ বাংলাদেশের বিমান চলাচল ব্যবস্থাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানীর বনানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত এভিয়েশন খাতের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ভৌগোলিক ও কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশকে একটি শীর্ষস্থানীয় আঞ্চলিক এভিয়েশন হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি সর্বাত্মক ও সমন্বিত ‘এভিয়েশন মাস্টারপ্ল্যান’ বাস্তবায়নের কাজ চলছে। বগুড়ায় পরিকল্পিত পাইলট ট্রেনিং একাডেমিটি হবে সেই বিশদ কর্মপরিকল্পনার একটি মৌলিক অংশ, যা দেশেই মানসম্পন্ন বৈমানিক ও বৈমানিক প্রকৌশলী গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।
দেশের প্রধান আকাশপথ অবকাঠামোর সম্প্রসারণ সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বহুল প্রতীক্ষিত তৃতীয় টার্মিনাল পুরোপুরি চালু হলে এর বাৎসরিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। এই নতুন অবকাঠামোটি বছরে প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ যাত্রীকে নিরবচ্ছিন্ন ও আন্তর্জাতিক মানের সেবা প্রদানে সক্ষম হবে। এই ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক যাত্রী ও কার্গো পরিবহনের চাহিদাকে সামাল দেওয়ার জন্য কেবল সরকারি খাতই নয়, বরং বেসরকারি এয়ারলাইনসগুলোকেও তাদের বহর সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়নে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বোয়িং কোম্পানির সাথে ২১টি উড়োজাহাজ ভাড়ার এই চুক্তি সেই জাতীয় লক্ষ্য অর্জনে একটি বড় সংযোজন।
কেবল বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থাই নয়, সরকারি সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসও তাদের পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গতিশীল পদক্ষেপ নিয়েছে। রাষ্ট্রায়ত্ত এই প্রতিষ্ঠানটির বহরেও ধাপে ধাপে ১৪টি নতুন বোয়িং উড়োজাহাজ যুক্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বিশ্ববাজারের সাথে তাল মিলিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পথগুলোতে যাত্রীসেবার পরিধি বাড়ানোই এই সার্বিক বিমান বহর সম্প্রসারণের মূল উদ্দেশ্য। সরকারি নীতি, আইনি কাঠামো ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা সংস্কারের মাধ্যমে দেশীয় বেসরকারি বিমান সংস্থাসমূহের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিকে আরও বেশি গতিশীল ও টেকসই করার আশ্বাস দেন সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকেরা।
আন্তর্জাতিক স্তরে যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা তুলে ধরে সরকারের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা জানান, তৃতীয় টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার পর এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিমাঞ্চলীয় দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের আকাশপথের যোগাযোগে নতুন মাত্রা যুক্ত হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিক যাত্রীদের জন্য বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এশীয় এভিয়েশন হাব হয়ে ওঠার যে বৈশ্বিক স্বপ্ন রয়েছে, তা বাস্তবায়িত হবে।
তবে দেশীয় বেসরকারি এভিয়েশন খাতের সুষম বিকাশে বেশ কিছু বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও পরিচালনগত কাঠামোগত বিষয় আলোচনার দাবি রাখে। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এভিয়েশন উদ্যোগগুলোর জন্য পরিচালনা ব্যয় বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে, বিশ্বজুড়ে জ্বালানিসংকট তৈরি হওয়ার কারণে এয়ারলাইনসগুলোর প্রধান ব্যয় খাত—জেট ফুয়েলের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়াও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং কর ছাড়ের মতো আর্থিক প্রণোদনা প্রদান এই খাতের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্ট শিল্প অংশীজনদের এসব যৌক্তিক দাবির প্রেক্ষিতে একটি অনুকূল আমলাতান্ত্রিক ও আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে জানানো হয় যে, ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে চুক্তিবদ্ধ নতুন বোয়িং উড়োজাহাজগুলো ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের বহরে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এই কৌশলগত বিমান সংযোজন শুধু একক কোনো প্রতিষ্ঠানের উন্নতি নয়, বরং সামগ্রিকভাবে পুরো দেশের এভিয়েশন খাতের রূপান্তরে একটি যুগান্তকারী মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে। সংবাদ সম্মেলনে বিদেশি এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ, প্রযুক্তি সরবরাহকারী বোয়িং প্রতিনিধি, কূটনৈতিক ব্যক্তিবর্গ এবং সিভিল এভিয়েশনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত থেকে বিশ্ব এভিয়েশন মানচিত্রে বাংলাদেশের এই বলিষ্ঠ পদচারণাকে সাধুবাদ জানান।


