সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোতে ড্রোন হামলার জবাবে ইরাকে মার্কিন-সৌদি যৌথ বিমান হামলা, নিহত ৮

সৌদি জ্বালানি অবকাঠামোতে ড্রোন হামলার জবাবে ইরাকে মার্কিন-সৌদি যৌথ বিমান হামলা, নিহত ৮

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রগুলোতে সাম্প্রতিক ড্রোন হামলার জবাব হিসেবে ইরাকে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর যৌথ সামরিক অভিযান পরিচালনা করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। বুধবার ভোরে পরিচালিত এই যৌথ বিমান হামলায় ইরাকের সরকারি আধা-সামরিক বাহিনী ‘পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সের’ (পিএমএফ) বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি, অস্ত্রাগার ও সরবরাহ কেন্দ্র লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এতে অন্তত আটজন সেনা সদস্য নিহত এবং আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে এই সমন্বিত সামরিক পদক্ষেপ নতুন করে গভীর আঞ্চলিক সংকটের সৃষ্টি করেছে।

ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র থেকে জানা গেছে, দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় নিনেভেহ প্রদেশে পরিচালিত বিমান হামলায় পিএমএফের আটজন সদস্য প্রাণ হারান। নিনেভেহর পাশাপাশি দেশটির দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলীয় বাসরা, কারবালা, কিরকুক এবং দিয়ালা প্রদেশে অবস্থিত সামরিক অবকাঠামোর ওপরও ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়। বিমান হামলার পরপরই বাসরার উপত্যকা ও নিনেভেহ প্রদেশের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি থেকে বিপুল পরিমাণ ধোঁয়ার কুণ্ডলি আকাশে উঠতে দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও চিত্রে দেখা যায়, বাসরার দুর্ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস ও জরুরি উদ্ধারকারী দলের গাড়িগুলো দ্রুত উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এবং সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এই যৌথ অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। সেন্টকমের বিবৃতিতে জানানো হয়, গত ৭২ ঘণ্টায় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় সৌদির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ও রাজধানী রিয়াদের গুরুত্বপূর্ণ পেট্রোলিয়াম কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্য করে অন্তত ৩০টি ড্রোন হামলা চালানো হয়েছিল। একই সময়ে আমেরিকান সামরিক ঘাঁটিতেও আক্রমণের চেষ্টা করা হয়। এসব শত্রুভাবাপন্ন কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত জবাব দিতেই পূর্ব ও উত্তর ইরাকে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট দলগুলোর কৌশলগত অবকাঠামো ও অস্ত্রাগারে এই সুনির্দিষ্ট যৌথ হামলা চালানো হয়েছে।

মার্কিন সেন্টকম আরও উল্লেখ করে যে, ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যবর্তী সময়ে এই ইরান-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের অবকাঠামো ও নাগরিকদের লক্ষ্য করে প্রায় ছয় শতাধিক আক্রমণ পরিচালনা করেছে। যৌথ বাহিনীর সামরিক কর্মকর্তারা সতর্ক করে দিয়ে জানান, আরও বড় ধরনের ক্ষতি এড়াতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সশস্ত্র দলগুলোকে যেকোনো ধরনের সহিংস আগ্রাসন থেকে অবিলম্বে বিরত থাকতে হবে। অন্যথায় এ জাতীয় নিরাপত্তা হুমকির বিরুদ্ধে মার্কিন ও সৌদি বাহিনী সমন্বিত প্রতিরোধ চালিয়ে যাবে।

অন্যদিকে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়, সৌদি আরবের তেল শোধনাগার ও জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে ইরাকি ভূখণ্ড থেকে ছোড়া বেশ কিছু আত্মঘাতী ড্রোন তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সফলভাবে মাঝআকাশেই ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। বিবৃতিতে স্পষ্ট জানানো হয়, রিয়াদ অঞ্চলে কোনো প্রকার যুদ্ধ বা উত্তেজনা বাড়াতে চায় না, তবে জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় যেকোনো আগ্রাসনের কঠোর আইনি ও সামরিক জবাব দেওয়া হবে।

এদিকে, এই হামলার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স। বাহিনীর সদর দপ্তর থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে একে ‘ইরাকের সার্বভৌমত্বের ওপর এক নগ্ন হামলা’ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর ‘চরম বিপজ্জনক উস্কানিমূলক পদক্ষেপ’ বলে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। তারা জানায়, সরকারি বাহিনীর অংশ হিসেবে থাকা স্থাপনাগুলোতে এ ধরনের হামলায় দেশটির নিরাপত্তা ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে এবং হতাহতের সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নির্ধারণে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

পরিস্থিতির সার্বিক পর্যালোচনায় ইরাকি প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি দ্রুত তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। ইরাক সরকারের পক্ষ থেকে পুনরায় নিশ্চিত করা হয়েছে যে, দেশের ভূখণ্ডকে কোনো অবস্থাতেই প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্র বা বন্ধুপ্রতীম দেশের বিরুদ্ধে হামলার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। উদ্ভূত সংঘাত এড়াতে এবং কূটনৈতিক সমাধান খুঁজতে ইরাকি প্রধানমন্ত্রী শিগগিরই সৌদি আরব সফরে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন বলে জানা গেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইরাকের অভ্যন্তরীণ ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সরাসরি যৌথ বিমান হামলা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন একটি মাত্রার সংযোজন করেছে। এই ঘটনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি করার পাশাপাশি পুরো অঞ্চলে প্রক্সি লড়াইকে একটি উন্মুক্ত সঙ্ঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্যও নতুন আশঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ