২০২৬ বিশ্বকাপে ভিএআর বিশ্লেষণে আইএফএবির অমিল, যুক্তির পক্ষে ফিফা

২০২৬ বিশ্বকাপে ভিএআর বিশ্লেষণে আইএফএবির অমিল, যুক্তির পক্ষে ফিফা

খেলাধুলো ডেস্ক

বিশ্ব ফুটবলের আইন প্রণয়নকারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (আইএফএবি) এবং আন্তর্জাতিক ফুটবল ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফার মধ্যে নতুন করে প্রযুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে। ২০২৬ বিশ্বকাপের দুটি ম্যাচে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) প্রয়োগের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তগত ভুল ছিল বলে নিজেদের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায় উল্লেখ করেছে আইএফএবি। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচসহ কয়েকটি ম্যাচের একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।

আইএফএবির পর্যালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুইজারল্যান্ডের ফরোয়ার্ড ব্রিল এম্বোলোর দ্বিতীয় হলুদ কার্ড বা লাল কার্ডের ঘটনাটি। ম্যাচের একপর্যায়ে ভিএআরের হস্তক্ষেপে রেফারি জোয়াও পিনহেইরো এম্বোলোকে দ্বিতীয় সতর্কবার্তা দিয়ে মাঠ থেকে বহিষ্কার করেন। এর ফলে লিওনেল মেসিদের বিপক্ষে বাকি খেলা সুইজারল্যান্ডকে ১০ জন নিয়ে খেলতে হয়েছিল, যা ম্যাচের গতিপথ বিশ্লেষণে বড় প্রভাব ফেলে। আইএফএবির নিয়ম নির্দেশিকা অনুযায়ী, ফুটবলের ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ বা ‘ভুল পরিচয় শনাক্তকরণ’ সংক্রান্ত নিয়মটি কেবল কোনো অপরাধী খেলোয়াড়কে সঠিকভাবে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হওয়ার বিধান রয়েছে। এটি নতুন করে কোনো অপরাধের ধরন বিচার করা বা ‘সিমুলেশন’ (ডাইভিং বা অভিনয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে বিভ্রান্ত করা) প্রমাণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে না। সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, বিধির সঠিক প্রয়োগ হলে এম্বোলো সে সময় দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখতেন না এবং ম্যাচটির সিদ্ধান্ত ভিন্ন হতে পারত।

একই ধরণের ঘটনা ঘটেছিল যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে প্যারাগুয়ের ম্যাচেও, যেখানে প্যারাগুয়ের খেলোয়াড় মিগেল আলমিরন অনুরূপ সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হন। ফলে পুরো বিশ্বকাপজুড়ে আন্তর্জাতিক ম্যাচ পরিচালনায় প্রোটোকলের প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আইএফএবি। তাদের মতে, ফুটবলের প্রচলিত আইনের বাইরে গিয়ে প্রযুক্তির এ ধরনের ব্যবহার ভবিষ্যৎ রেফারিংয়ের ক্ষেত্রে বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে।

তবে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারির এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে স্পষ্ট ও ভিন্ন অবস্থান প্রকাশ করেছে ফিফা। ফুটবলের সর্বোচ্চ এই নিয়ন্ত্রক সংস্থার দাবি, মাঠে রেফারি কিংবা ভিএআরের দেওয়া উক্ত সিদ্ধান্তে কোনো ভুল ছিল না। ফিফা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ম্যাচের আসল চেতনা বা ‘স্পিরিট অব দ্য ল’ রক্ষা করতেই সেই মুহূর্তগুলোতে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। বিচার বিভাগীয় বা প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে সমান নিরপেক্ষতার সঙ্গেই প্রয়োগ করা হয়েছে। সিমুলেশনের মাধ্যমে মাঠের পরিস্থিতি ঘোলাটে করে প্রতিপক্ষ বা ম্যাচকে প্রভাবিত করার অপচেষ্টা রোধ করাই এই সিদ্ধান্তের মূল উদ্দেশ্য ছিল বলে ফিফার পক্ষে জোর দেওয়া হয়।

ফিফা আরও যুক্তি তুলে ধরে যে, সিমুলেশন বা প্রতারণামূলক অভিনয়ের দরুন প্রতিপক্ষের ওপর যেন কোনো অন্যায় সুবিধা তৈরি না হয় এবং প্রকৃত অপরাধী রেহাই না পায়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। অহেতুক শাস্তি কিংবা হলুদ কার্ড জমে স্থগিতাদেশের শিকার হওয়া রোধ করতেই রেফারি সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা চূড়ান্ত অর্থে ফুটবলের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করেছে। সংস্থাটির ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো ব্যক্তি বা প্রযুক্তির বিভ্রান্তি নয়, বরং নিয়মের পেছনের মূল উদ্দেশ্যকেই সুসংগঠিতভাবে প্রতিফলন করা হয়েছে।

বিশ্বকাপের জোড়া ঘটনার পর ভবিষ্যৎ ফুটবল আইনের সংস্কার নিয়েও কাজ শুরু করার আশ্বাস দিয়েছে দুটি সংস্থাই। আইএফএবি এবং ফিফা উভয়েই এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছে যে, আইএফএবির বার্ষিক সাধারণ সভার আলোচনা ও সার্কুলারের মন্তব্যগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে। পরবর্তীতে ভিএআর প্রোটোকল সংস্কার ও পুনর্লিখনের জন্য যে যৌথ উদ্যোগ নেওয়া হবে, তাতে এই বিতর্কিত ‘মিস্টেকেন আইডেন্টিটি’ ও ‘সিমুলেশন’ সংক্রান্ত ধারাগুলোকে আরও স্পষ্ট ও নিখুঁত করার বিষয়ে সম্মতি এসেছে। এর মাধ্যমে আগামী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রযুক্তির ব্যবহার আরও স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

খেলাধূলা শীর্ষ সংবাদ