মোহাম্মদপুরে ট্রাকচালক হোসেন হত্যা মামলা: শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিচার শুরুর প্রক্রিয়া পিছাল, ১ সেপ্টেম্বর শুনানি

মোহাম্মদপুরে ট্রাকচালক হোসেন হত্যা মামলা: শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিচার শুরুর প্রক্রিয়া পিছাল, ১ সেপ্টেম্বর শুনানি

আইন ও বিচার ডেস্ক
রাজধানীর মোহাম্মদপুর থানা এলাকায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে ট্রাকচালক মো. হোসেনকে গুলি করে হত্যার অভিযোগে করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন (চার্জগঠন) বিষয়ক শুনানির তারিখ পিছিয়েছে। আগামী ১ সেপ্টেম্বর শুনানির নতুন দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত। কারাগারে থাকা চার আসামিকে অন্য মামলায় হাজিরাজনিত কারণে প্র প্রয়োজনীয় পরোয়ানা (পিডাব্লিউ) প্রস্তুত করে আদালতে হাজির না করায় রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ নির্দেশ দেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দুপুরে উভয় পক্ষের আইনি বক্তব্য গ্রহণ শেষে ঢাকার ৪ নম্বর বিশেষ জজ আদালতের বিচারক রবিউল আলম এই আদেশ দেন। শুনানিকালে মামলাটিতে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা চার আসামিকে অন্য মামলায় হাজিরার দরুন এ আদালতে আনা সম্ভব হয়নি বলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আদালতকে অবহিত করা হয়।
মামলার রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী শুনানির বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আলোচ্য মামলায় অভিযুক্ত ৩৪ জন আসামির মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বড় একটি অংশ বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। অন্যদিকে, অন্য মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারা হেফাজতে থাকা চার আসামিকে এই মামলায় আনুষ্ঠানিকভাবে আদালতে উপস্থিত করার উদ্দেশ্যে প্রোডাকশন ওয়ারেন্ট (পিডাব্লিউ) আবেদন করা হয়েছিল। বিচারক আবেদনটি মঞ্জুর করে আসামিদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন এবং একই সঙ্গে চার্জগঠন শুনানির পরবর্তী তারিখ ১ সেপ্টেম্বর পুনর্নির্ধারণ করেছেন।
আদালত ও মামলার বিচারিক নথিসূত্রে জানা গেছে, শুনানির নির্ধারিত দিনে জামিনে ও গ্রেপ্তার হয়ে কারা হেফাজতে থাকা মোট আট আসামিকে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্য দিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে বিচারক তাদের পুনরায় কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। শেখ হাসিনাসহ মামলার অপরাপর পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে আইনগত প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার কাজ আদালতের মাধ্যমে চলমান রয়েছে।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশব্যাপী আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার পর ১৯ জুলাই রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চাঁদ উদ্যান এলাকায় ব্যাপক সহিংসতা ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। নিহত মো. হোসেন পেশায় একজন মালবাহী ট্রাকের চালক ছিলেন। ঘটনার দিন তিনি গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকায় নিজের ট্রাকটি নিরাপদ স্থানে পার্কিং করে হেঁটে মোহাম্মদপুরের বাসায় ফিরছিলেন। পথে চাঁদ উদ্যান সংলগ্ন এলাকায় পৌঁছালে তিনি আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে মারাত্মকভাবে বিদ্ধ হন এবং ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর তদন্তপ্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ৩১ আগস্ট নিহত ট্রাকচালকের মা রীনা বেগম বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলায় তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে বেপরোয়া বলপ্রয়োগের নির্দেশ ও পরিকল্পনার অভিযোগ আনা হয়।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর মোহাম্মদপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আকরামুজ্জামান আদালতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাজনৈতিক নির্দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় পথচারী ও শ্রমজীবী মানুষ হিসেবে হোসেন নির্মম সহিংসতার শিকার হন।
হত্যা মামলাটিতে ক্ষমতাচ্যুত সরকারের একাধিক সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের আসামি করা হয়েছে। চার্জশিটভুক্ত উল্লেখযোগ্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, সাবেক বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং সাবেক সংসদ সদস্য সাদেক খান।
এ ছাড়া নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালি আসিফ ইনান, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা আসিফ আহম্মেদ, তারেকুজ্জামান রাজিব, শেখ বজলুর রহমান, নুর মোহাম্মদ সেন্টু, তোফায়েল সিদ্দিক ওরফে তুহিন, রহমান মিয়া ওরফে এ কে এম অহিদুর রহমান, পলাশ, ওলিউর রহমান, খলিলুর রহমান, ইমন, এস এম রিয়াজুল হক তামিম, মাসুদুর রহমান বিপ্লব, আব্দুস সাত্তার ভূইয়া ওরফে এম এ সাত্তার, পারভেজ ওরফে গোল্ডেন পারভেজ, সুমন মিয়া ওরফে কাইল্লা সুমন, মিলন হোসেন, সোহেল ওরফে ভূইয়া সোহেল ওরফে বুনিয়া সোহেল, সলিম উল্লাহ সলু, ইরফান, মুহাম্মদ বদিউল আলম ওরফে বদিউজ্জামান, ফুরকান হোসেন, শাহজাহান খান, সাজ্জাদ হোসেন, ফারুক হোসেন অভি ও নাইমুল হাসান রাসেলকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইনজীবীরা জানান, চার্জশিটভুক্ত আসামিদের মধ্যে জুনাইদ আহমেদ পলক, সাদেক খান, ফুরকান হোসেন ও শাহজাহান খান বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। ১ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত নতুন তারিখে সকল আসামির উপস্থিতি নিশ্চিত করা সম্ভব হলে অভিযোগ গঠনের শুনানি শুরু হবে। চার্জগঠন সম্পন্ন হলে মামলাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রবেশ করবে এবং সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায় শুরু হবে।
আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ