আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা কেবল একটি নির্দিষ্ট দেশের ওপর আরোপিত পদক্ষেপ নয়, বরং এটি বৈশ্বিক সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী একটি সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের একতরফা পদক্ষেপ কেবল সংশ্লিষ্ট দেশের অর্থনীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং তা বিশ্বজুড়ে স্বাধীন বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিকেও বাধাগ্রস্ত করছে।
তেহরানের দাবি, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি যে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তা আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি ও জাতিসংঘ সনদের মৌলিক নীতিগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে, জাতিসংঘ সনদের সার্বভৌম সমতার নীতির ব্যত্যয় ঘটিয়ে একটি পরাশক্তি রাষ্ট্র যখন অন্য দেশের ওপর নিজের আইন ও কর্তৃত্ব চাপিয়ে দিতে চায়, তখন তা বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
ইরানি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ আইন বা একতরফা সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে কার্যকর হতে পারে না। বিশ্বের প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব আইনি কাঠামোর অধীনে পরিচালিত হয়। ফলে বিদেশি ব্যাংক, করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা বাণিজ্যিক বিমানবন্দরগুলোকে অন্য দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক ও বৈধ বাণিজ্য বন্ধে বাধ্য করার কোনো আইনি এখতিয়ার বা অধিকার অন্য কোনো রাষ্ট্রের নেই। এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মৌলিক কাঠামোকে ভেঙে দিতে পারে এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞার সবচেয়ে জটিল দিক হলো এর সেকেন্ডারি বা পরোক্ষ প্রভাব। এই ধরনের নিষেধাজ্ঞার কারণে তৃতীয় পক্ষের দেশগুলোর কোম্পানি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও বিপাকে পড়ে। ইরানের মতে, এই পদ্ধতি কেবল অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের মাধ্যম নয়, বরং এটি এক ধরনের বলপ্রয়োগ যা আন্তর্জাতিক আইনের শাসনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে। এ ধরনের চাপ অব্যাহত থাকলে তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আস্থার সংকট তৈরি করবে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
ইরানের পক্ষ থেকে আরও সতর্ক করা হয়েছে যে, অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি যদি কোনো ধরনের নৌ অবরোধ বা কঠোর সামরিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা করা হয়, তবে তা বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিশ্বের ছোট ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব সরাসরি শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর ইচ্ছার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক আমলের অবমূল্যায়ন ও আধিপত্যবাদী মানসিকতা পুনরুত্থিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া বিশ্ব অর্থনীতিকে মেরুকরণের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। একরফা নিষেধাজ্ঞার কারণে অনেক দেশই এখন মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প মুদ্রায় বা বাণিজ্যের নিজস্ব মাধ্যম খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ইরানের এই সাম্প্রতিক হুংকার মূলত বৈশ্বিক দক্ষিণের (গ্লোবাল সাউথ) দেশগুলোর উদ্বেগেরই বহিঃপ্রকাশ, যারা একমেরুকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক আধিপত্যের পরিবর্তে বহুমেৰুকেন্দ্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার দাবি জানিয়ে আসছে।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব কেবল দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি বিশ্ব বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথ, আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা এবং ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব সুরক্ষার প্রশ্নটিকে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একতরফা নিষেধাজ্ঞার নেতিবাচক প্রভাবগুলো গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা।


