নুসরাত হত্যা মামলা: অধ্যক্ষ সিরাজসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের যাবজ্জীবন ও ১০ জন খালাস হাইকোর্টে

নুসরাত হত্যা মামলা: অধ্যক্ষ সিরাজসহ দুজনের মৃত্যুদণ্ড বহাল, চারজনের যাবজ্জীবন ও ১০ জন খালাস হাইকোর্টে

আইন আদালত ডেস্ক
ফেনীর সোনাগাজীর আলোচিত মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলায় নিম্ন আদালতের রায় সংশোধন করে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্ত হওয়া অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাসহ দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে চার আসামির সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অপর ১০ আসামিকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে।
বিচারপতি ভীষ্মদেব চক্রবর্তী ও বিচারপতি কে এম রাশেদুজ্জামান রাজার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট ডেথ রেফারেন্স ও আসামিদের করা আপিলের ওপর শুনানি শেষে এ রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের রায়ের বিবরণ
বিচারিক আদালতের রায়ে পূর্বে অভিযুক্ত ১৬ জন আসামির সবাইকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। হাইকোর্টের পর্যালোচনায় আসামিদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের মাত্রা, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে সাজা পুনর্বিন্যাস করা হয়। সর্বোচ্চ সাজাপ্রাপ্ত মূল পরিকল্পনাকারী অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা ও অপর একজনের অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় আদালত তাদের মৃত্যুদণ্ডের আদেশ বহাল রাখেন। হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ও সহায়তাকারী হিসেবে চারজনকে আমৃত্যু যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। অন্যদিকে পর্যাপ্ত ও সন্দেহাতীত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে ১০ জন আসামিকে খালাস প্রদান করেন আদালত।
ঘটনার পটভূমি ও মামলা
মামলার নথিপত্র ও অভিযোগপত্র অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলা আলিম পরীক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফিকে নিজ অফিস কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্লীলতাহানি করেন। এ ঘটনায় নুসরাতের পরিবার স্থানীয় থানায় মামলা দায়ের করলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়।
গ্রেপ্তারের পর থেকেই মামলাটি প্রত্যাহারের জন্য নুসরাত ও তার পরিবারের ওপর স্থানীয় একটি মহল ও অধ্যক্ষের অনুসারীরা চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ৬ এপ্রিল আলিম পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসাকেন্দ্রে যান নুসরাত। সেখানে পূর্বপরিকল্পিতভাবে পরীক্ষার হল থেকে ডেকে মাদ্রাসার সাইক্লোন শেল্টারের ছাদে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। সেখানে মামলা প্রত্যাহারে অস্বীকৃতি জানালে দুর্বৃত্তরা তার হাত-পা বেঁধে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।
চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু ও আইনি পদক্ষেপ
গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় নুসরাতকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে এবং পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে লাইফ সাপোর্টে থাকা অবস্থায় চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টার পরও শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে যাওয়ায় ঘটনার চার দিন পর, ১০ এপ্রিল রাতে মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
অগ্নিসংযোগের ঘটনার পরপরই নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় হত্যাচেষ্টা মামলা দায়ের করেছিলেন। নুসরাতের মৃত্যুর পর তা একটি হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তদন্ত সম্পন্ন করে এজাহারভুক্ত এবং তদন্তে প্রাপ্ত আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে।
বিচারিক আদালত ও হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
২০১৯ সালের ২৪ অক্টোবর ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল সংক্ষিপ্ত সময়ে বিচারিক কার্যক্রম শেষ করে মামলার ১৬ আসামির সবাইকেই মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছিলেন। প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদনের জন্য মামলার নথি ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে পাঠানো হয় এবং আসামিপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করেন।
উচ্চ আদালতে উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন এবং মামলার সামগ্রিক তথ্য-প্রমাণ দীর্ঘ পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত এল। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ আদালতের এই পর্যবেক্ষণ ও রায় বাংলাদেশে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী নারীদের সুরক্ষায় এবং ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে কাজ করবে।
আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ