আফগানিস্তানের বিপক্ষে টেস্টের প্রথম দিনে শুরুটা দারুণ হলেও শেষটা স্বস্তির হয়নি বাংলাদেশের। দুই ওপেনারের ব্যাটে শতরানের জুটি, দুজনেরই অর্ধশতক—সব মিলিয়ে প্রথম সেশনে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ছিল বাংলাদেশের হাতে। কিন্তু দ্বিতীয় সেশনে হঠাৎ ব্যাটিং ধসে মাত্র ৪ রানের মধ্যে ৩ উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে দলটি। পরে লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাটে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও দিন শেষে ৮ উইকেটে ৩১৭ রান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
শুক্রবার প্রথম দিনের খেলা শেষে বাংলাদেশের সংগ্রহ ৮ উইকেটে ৩১৭ রান। লিটন দাস ৫৩ রান করে ফিরেছেন। মেহেদী হাসান মিরাজের ব্যাট থেকে এসেছে ২৪ রান। দিন শেষে নাঈম হাসান ১১ ও তাইজুল ইসলাম ৪ রানে অপরাজিত আছেন। শনিবার দ্বিতীয় দিনের খেলা শুরু করবেন এই দুই ব্যাটসম্যান।
দিনের শুরুতে টস জিতে ব্যাটিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। দুই ওপেনার সাদমান ইসলাম ও তানজিদ হাসান শুরু থেকেই সাবলীল ব্যাটিং করেন। সাদমান ছিলেন কিছুটা সতর্ক, অন্যদিকে তানজিদ খেলেন আক্রমণাত্মক মেজাজে। আফগান বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে দ্রুত রান তুলতে থাকেন তিনি। মাত্র ৪১ বলে অর্ধশতক পূর্ণ করেন এই ওপেনার। টেস্ট ক্যারিয়ারে এটি তাঁর দ্বিতীয় অর্ধশতক ছাড়ানো ইনিংস। এর আগে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ডারউইন টেস্টে সেঞ্চুরি করেছিলেন তানজিদ।
অন্য প্রান্তে সাদমানও ধীরে ধীরে নিজের ইনিংস বড় করতে থাকেন। শুরুতে পাঁচ রানে ক্যাচ দিয়ে জীবন পেয়েছিলেন তিনি। কাভারে তাঁর ক্যাচ নিতে পারেননি আফগান অধিনায়ক হাশমতউল্লাহ শহীদি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তানজিদের সঙ্গে গড়ে তোলেন গুরুত্বপূর্ণ উদ্বোধনী জুটি।
দুজনের ব্যাটে ১৮ ওভারেই এক শ রান পূর্ণ করে বাংলাদেশ। গত বছরের নভেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্টের পর আবারও উদ্বোধনী জুটিতে শতরানের দেখা পেল দলটি। তানজিদ ও সাদমানের জুটিতে আসে ১২৪ রান। মাত্র ৭১ বলে ৮৩ রানের ঝোড়ো ইনিংস খেলেন তানজিদ। তাঁর ইনিংসে ছিল আগ্রাসী ব্যাটিংয়ের ছাপ। তবে সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও শেষ পর্যন্ত ইনিংসটি তিন অঙ্কে নিতে পারেননি তিনি। ইসমত আলমের বলে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে ফিরতে হয় তাঁকে। উইকেটকিপার ইকরাম আলিখিল দারুণ ক্যাচ নিয়ে শেষ করেন তানজিদের ইনিংস।
তানজিদ ফেরার পরও বাংলাদেশের রান তোলার গতি খুব একটা কমেনি। প্রথম সেশন শেষে ১ উইকেটে ১৩৪ রান তুলে বেশ ভালো অবস্থানে ছিল দলটি। সাদমান তখন ৪১ রানে অপরাজিত। অন্যদিকে মুমিনুল হক ক্রিজে এসে যোগ দেন পাঁচ রান।
দ্বিতীয় সেশনেও শুরুতে রান তুলতে সমস্যা হয়নি বাংলাদেশের। তবে সাদমান ৬৭ রান করে ফিরলে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। মোহাম্মদ সেলিম সাফির বুকসমান উচ্চতার শর্ট বলে পুল করতে গিয়ে বল মাটিতে রাখতে পারেননি এই ওপেনার। স্কয়ার লেগে থাকা জিয়া-উর-রহমান ক্যাচটি তালুবন্দী করেন। সেঞ্চুরির সম্ভাবনা জাগিয়েও তানজিদের মতো সাদমানকেও ফিরতে হয় অর্ধশতকের পর।
এরপর মুমিনুল হক ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন কিছুটা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু ৩৯ রান করে মুমিনুলের বিদায়ের পর দ্রুত ভেঙে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটিং। ইয়ামিন আহমদজাইয়ের বলে কাভারে রহমত শাহর হাতে ক্যাচ দেন মুমিনুল। এর কিছুক্ষণ পর একই বোলারের বলে বোল্ড হয়ে শূন্য রানে ফেরেন অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম। এরপর স্পিনার কায়েস আহমেদের বলে ২৯ রান করে আউট হন অধিনায়ক নাজমুল হোসেন।
একসময় ২ উইকেটে ২২১ রান করা বাংলাদেশ মাত্র ৪ রান যোগ করতেই হারায় আরও তিন উইকেট। ২২৫ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে বড় বিপদে পড়ে দলটি। আফগান বোলাররা এই সময়ে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়ান। পেসারদের লাইন-লেংথ ও গতির সঙ্গে স্পিনারদের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে চাপে পড়ে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। প্রথম সেশনে যে দলকে বেশ আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল, তারাই দ্রুত উইকেট হারিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ অনেকটা প্রতিপক্ষের হাতে তুলে দেয়। এ অবস্থায় দলের হাল ধরার চেষ্টা করেন লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজ। দুজনের জুটিতে আসে গুরুত্বপূর্ণ ৪২ রান। তবে মিরাজও ইনিংস বড় করতে পারেননি। ইসমত আলমের অফ স্টাম্পের বাইরের বল ব্যাটে লেগে স্টাম্পে আঘাত করলে ২৪ রান করে ফিরতে হয় তাঁকে। এরপর বাংলাদেশের ভরসা হয়ে ওঠেন লিটন।
দীর্ঘদিন ধরে বড় ইনিংসের অপেক্ষায় থাকা লিটন এদিন শুরুতে কিছুটা ধীরে খেললেও পরে নিজের ছন্দ খুঁজে পান। মোহাম্মদ সেলিম সাফির বলে চার মেরে অর্ধশতক পূর্ণ করেন তিনি। আগের তিন ইনিংসে শূন্য রানে আউট হওয়া লিটনের জন্য এই ফিফটি ছিল স্বস্তির। তবে অর্ধশতক পূর্ণ করার পর বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি তিনি। সেলিম সাফির বলে ক্যাচ তুলে দিয়ে ৫৩ রানে সাজঘরে ফেরেন এই উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান।
লিটনের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ইনিংস আরও বড় চাপে পড়ে। তিন শ রান পার করলেও তখন কত দূর যাওয়া যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। শেষ দিকে নাঈম হাসান ও তাইজুল ইসলাম উইকেটে থেকে দলকে ৩১৭ রানে পৌঁছে দেন। দিন শেষে দুজনই অপরাজিত থাকায় দ্বিতীয় দিনে বাংলাদেশের ইনিংস আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ থাকছে।
প্রথম সেশনে তানজিদ ও সাদমানের ব্যাটে বড় সংগ্রহের সম্ভাবনা তৈরি হলেও পরের দুই সেশনে আফগানিস্তান ম্যাচে ফেরে। বাংলাদেশের আট উইকেট তুলে নিয়ে সফরকারীরা দিন শেষ করেছে স্বস্তি নিয়ে। অন্যদিকে বাংলাদেশের লক্ষ্য থাকবে দ্বিতীয় দিনে শেষ দুই উইকেট নিয়ে যতটা সম্ভব রান বাড়ানো, যাতে প্রথম ইনিংসে লড়াই করার মতো সংগ্রহ দাঁড় করানো যায়।

