বিনোদন ডেস্ক
রাজধানীর একটি সামাজিক অনুষ্ঠান শেষে গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে নিজের ব্যক্তিগত জীবন, গ্রেপ্তারের অভিজ্ঞতা, চলমান আইনি লড়াই এবং দেশের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন ঢাকাই চলচ্চিত্রের অন্যতম পরিচিত মুখ চিত্রনায়িকা পরীমনি। দীর্ঘদিন এসব বিষয়ে নীরব থাকার পর সাম্প্রতিক নানা জল্পনা-কল্পনা এবং নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি তাঁর গভীর আস্থার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সম্প্রতি রাজধানীর শুটিং ক্লাবে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে নিজের জীবনধারা ও সামাজিক মাধ্যমের নানা প্রতিকূলতার কথা তুলে ধরেন এই অভিনেত্রী। বিশেষ করে ব্যক্তিজীবন ও বিয়ে সংক্রান্ত নতুন করে তৈরি হওয়া নানা গুঞ্জন প্রসঙ্গে নিজের ক্ষোভ ও বাস্তব চিত্র প্রকাশ করেন তিনি। পরীমনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে প্রতিনিয়ত নানামুখী মন্তব্য ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছবি প্রকাশ করলেও সাধারণ মানুষের নেতিবাচক মন্তব্যের শিকার হতে হয় তাঁকে। তিনি উল্লেখ করেন, অনুরাগী ও সাধারণ দর্শক তাঁকে একজন একক অভিভাবক হিসেবে দেখতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন এবং সন্তানকে ঘিরে তাঁর স্বাভাবিক জীবনযাত্রার প্রতিই তাদের আগ্রহ বেশি দেখা যায়।
নিজের আলোচিত গ্রেপ্তার প্রসঙ্গ টেনে পরীমনি সে সময়ের আইনি প্রক্রিয়া ও পদ্ধতিগত ত্রুটির বিষয়গুলো তুলে ধরেন। দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়ে নীরব থাকার ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি জানান, আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সত্য উদ্ঘাটিত হওয়ার জন্য তিনি ধৈর্যের সঙ্গে অপেক্ষা করছিলেন। অভিনেত্রীর দাবি, গ্রেপ্তারের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় আইনি বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। তাঁর বাসভবনে তল্লাশি চালানো কিংবা তাঁকে আটক করার সময় সংশ্লিষ্টদের কাছে কোনো বৈধ ওয়ারেন্ট বা নির্দিষ্ট অনুমতিপত্র ছিল না। পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনা করে তাঁর মনে হয়েছে, পুরো বিষয়টি একটি সুপরিকল্পিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করা হয়েছিল।
গ্রেপ্তার পরবর্তী সময় এবং দীর্ঘ ছয় বছরের মানসিক ও সামাজিক প্রতিকূলতা পার হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এই শিল্পী জানান, দীর্ঘ সময়ের আত্মসংযম ও ধৈর্যই তাঁকে মানসিকভাবে টিকিয়ে রেখেছে। আইনি জটিলতা এবং সামাজিক চাপের মুখেও সত্য এক দিন প্রকাশ্যে আসবে—এমন বিশ্বাসই তাঁকে সাহস জুগিয়েছে। বর্তমান সময়ে আইনি প্রক্রিয়ার অগ্রগতি এবং মানসিক চাপমুক্ত থাকার অনুভূতির কথা ব্যক্ত করে তিনি জানান, সত্য প্রকাশের মাধ্যমে তিনি এখন মানসিকভাবে অনেক হাল্কা বোধ করছেন এবং নিজের স্বাভাবিক কর্মজীবনে মনোনিবেশ করতে পারছেন।
দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও আস্থার কথা জানিয়ে পরীমনি বলেন, রাষ্ট্র বা বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর তিনি কখনো অযাচিত চাপ সৃষ্টি বা আহাজারি করার চেষ্টা করেননি। আইনের প্রতি অনুগত থেকে তিনি নিয়মিতভাবে আদালতের হাজিরা দিয়ে যাচ্ছেন এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ অনুসরণ করছেন। তাঁর প্রত্যাশা, দীর্ঘ পর্যালোচনা শেষে বিচার বিভাগ চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে তাঁকে সম্পূর্ণরূপে নির্দোষ ঘোষণা করবে এবং তাঁর সামাজিক সম্মান ও মর্যাদা পূর্ণাঙ্গভাবে ফিরিয়ে দেবে।
সংবাদ সম্মেলনে পরীমনি কেবল নিজ প্রসঙ্গে সীমাবদ্ধ না থেকে দেশের সংস্কৃতি কর্মী ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি উল্লেখ করেন, নিরাপদ জীবনযাপনের অধিকার নির্দিষ্ট কোনো শ্রেণি বা পেশার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। শিল্পী, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ কিংবা রিকশাচালক—দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্যই একটি নিরাপদ, বৈষম্যহীন ও হয়রানিমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। যেকোনো ধরনের সামাজিক হেনস্তা ও মানসিক নির্যাতন থেকে মুক্ত থেকে নাগরিকরা যেন নিজ নিজ ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারেন, সেই উপযোগী পরিবেশ তৈরির জন্য তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানান।
বাংলাদেশের বিনোদন জগতে নিজের অভিনয়ের মাধ্যমে জায়গা করে নিলেও বিভিন্ন সময়ে ব্যক্তিগত ঘটনা ও আইনি জটিলতার কারণে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন পরীমনি। ২০২১ সালে তাঁর বাসভবনে পরিচালিত অভিযান ও পরবর্তী গ্রেপ্তারের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক চর্চার জন্ম দিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি পুনরায় তাঁর পেশাগত কাজ ও সন্তান লালন-পালনে আত্মনিয়োগ করেন। এতদিন পর ঘটনার পিছনের নানা দিক ও নিজের অবস্থান স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যার মাধ্যমে তিনি একদিকে যেমন ব্যক্তিগত নানা গুঞ্জনের অবসান ঘটালেন, অন্যদিকে দেশের আইনি কাঠামোর স্বচ্ছতা ও নাগরিক অধিকারের বিষয়েও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরলেন।


