তথ্যপ্রযুক্তি ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ব্রাউজার এজেন্টকে বিভ্রান্ত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর অজান্তে বার্তা পাঠানোর এক নতুন ঝুঁকির কথা প্রকাশ করেছেন সাইবার নিরাপত্তা গবেষকেরা। নিরাপত্তা সংস্থা ‘জেনিটি’র সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর তৈরি এআই ব্রাউজার ‘অ্যাটলাস’কে ভুল নির্দেশনা দিয়ে প্রতারিত করার মাধ্যমে ব্যবহারকারীর ডিভাইস থেকে তাঁর পরিচিতদের কাছে গোপনে স্প্যাম বার্তা পাঠানো সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে অনুষ্ঠিত শীর্ষস্থানীয় সাইবার নিরাপত্তা সম্মেলন ‘ব্ল্যাক হ্যাট’-এ এই সংক্রান্ত একটি কৌশলগত গবেষণা উপস্থাপন করেন জেনিটির গবেষকেরা। তাঁরা উল্লেখ করেন, এই প্রক্রিয়ায় বার্তা পাঠানোর ক্ষেত্রে হোয়াটসঅ্যাপের সরাসরি কোনো নিরাপত্তাত্রুটি বা এর সুরক্ষাব্যবস্থা ‘এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপশন’ ভাঙার প্রয়োজন হয় না। বরং ব্রাউজারে থাকা এআই এজেন্টকে কৌশলে প্রলুব্ধ ও প্রতারিত করে পুরো আক্রমণটি পরিচালনা করা যায়। এর ফলে ভবিষ্যতে এআইনির্ভর সিস্টেমগুলোর ওপর নির্ভর করে ব্যবহারকারীদের অজান্তেই বড় পরিসরে স্প্যাম বার্তা ছড়ানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জেনিটির এই গবেষণায় শুধু ওপেনএআই নয়, বরং গুগল, অ্যানথ্রপিক, মাইক্রোসফট এবং পারপ্লেক্সিটির মতো শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের তৈরি এআই ব্রাউজার ও ব্রাউজার এক্সটেনশনগুলোর প্রায় ২০টিরও বেশি নিরাপত্তা দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব স্পর্শকাতর দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে সাইবার অপরাধীরা চাইলে স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্টকে ব্যবহার করে আক্রান্ত ব্যক্তির কম্পিউটারে থাকা গোপনীয় ফাইল সংগ্রহ, দূর থেকে যন্ত্রটির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ, পাসওয়ার্ড ম্যানেজারে সংরক্ষিত তথ্য হাতিয়ে নেওয়া কিংবা ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে ব্যবহারকারীর অনুমতি ছাড়াই কেনাকাটা সম্পন্ন করার মতো মারাত্মক অপকর্ম সম্পাদন করতে পারে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক দশকে প্রচলিত ওয়েব ব্রাউজারগুলোর সুরক্ষাব্যবস্থা মূলত মানুষের প্রত্যক্ষ আচরণ ও ইন্টারঅ্যাকশনকে মাথায় রেখে গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে মানুষের জায়গায় যখন স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট কাজ করে, তখন এই প্রথাগত নিরাপত্তার নিয়মগুলো অনেক ক্ষেত্রে অকার্যকর হয়ে পড়ে। এমনকি বিভিন্ন ওয়েবসাইটের মধ্যে অননুমোদিত ও ক্ষতিকর তথ্য আদান-প্রদান প্রতিরোধে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহৃত ‘সেম-অরিজিন পলিসি’র মতো মৌলিক সুরক্ষাবলয়ও এআই এজেন্টের ব্যবহারের কারণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলশ্রুতিতে স্বয়ংক্রিয় এআই প্রযুক্তি সুবিধা দেওয়ার পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তায় সম্পূর্ণ নতুন মাত্রার অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির জন্ম দিচ্ছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ার বিষয়ে শঙ্কা প্রকাশ করে জেনিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) মাইকেল বার্গুরি সতর্ক করে বলেছেন, আধুনিক ব্রাউজারগুলোতে স্বয়ংক্রিয় এআই এজেন্ট যুক্ত হওয়ার কারণে সার্বিক নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অনেকটাই শিথিল হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় দুই দশক আগের মতো ব্রাউজারভিত্তিক সাইবার আক্রমণের চরম ঝুঁকিগুলো আবার নতুন রূপ নিয়ে সামনে আসছে। এআই এজেন্টকে যদি ব্রাউজারের সম্পূর্ণ কার্য পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয়, তবে ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট, আর্থিক লেনদেনের উপাত্ত এবং অন্যান্য সংবেদনশীল তথ্য যেকোনো সময় মারাত্মক হুমকিতে পড়তে পারে।
উল্লেখ্য, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় মেটা নিয়মিত নতুন প্রযুক্তি ও ফিচার যুক্ত করে চললেও স্বয়ংক্রিয় এআই প্রযুক্তির এমন মারাত্মক কৌশলগত ব্যবহার সাইবার সুরক্ষায় নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করল। প্রযুক্তিবিদরা মনে করছেন, বাণিজ্যিক ব্যবহারের আগে এআই ব্রাউজার এজেন্টগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা কাঠামো পুনরায় ঢেলে সাজানো না হলে ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ব্যবহারকারী বড় ধরনের ডিজিটাল নিরাপত্তার ঝুঁকিতে পড়বেন।


