পরিবেশ ও নগর ডেস্ক
বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এবং অপরিকল্পিত নগরায়ন ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের ফলে প্রতিদিন আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বায়ুদূষণ। এই বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতিতে বিশ্বের দূষিত বাতাসের নগরীগুলোর তালিকায় রাজধানী ঢাকার অবস্থান শীর্ষ ১০-এর মধ্যে বজায় রয়েছে। বিশ্বজুড়ে বায়ুর মান পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সের (আইকিউএয়ার) তাজা সূচক অনুযায়ী, মঙ্গলবার (১১ আগস্ট) বায়ুদূষণের বৈশ্বিক তালিকায় ঢাকার অবস্থান ৯ম। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী এদিন সকালে ঢাকার প্রাপ্ত বায়ুমাত্রা বা বায়ুদূষণ স্কোর ছিল ১৩২, যা সূচকের বিভাগ অনুযায়ী ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে চিহ্নিত।
আইকিউএয়ারের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বায়ুদূষণ সূচকে শীর্ষ স্থানটি দখল করেছে মালয়েশিয়ার কুচিং শহর, যার বায়ুমান স্কোর ছিল ১৭৬। ১৭২ স্কোর নিয়ে বৈশ্বিক তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালা। উভয় শহরের বাতাসের গুণমানই সর্বসাধারণের জন্য ‘অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থায় রয়েছে। দূষণের তালিকায় ১৬৯ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানে অবস্থান করছে কুয়েতের রাজধানী কুয়েত সিটি। এর পরপরই শীর্ষ তালিকার অন্যান্য স্থানগুলোতে যথাক্রমে রয়েছে ইরাকের রাজধানী বাগদাদ, পাকিস্তানের ঐতিহাসিক শহর লাহোর এবং মালয়েশিয়ার প্রধান মহানগরী কুয়ালালামপুর।
বায়ুর মান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি পরিমাপের জন্য নির্ধারিত বৈশ্বিক সূচক (একিউআই) অনুযায়ী বায়ুর মানকে মূলত ছয়টি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। এই মানদণ্ড অনুযায়ী, স্কোর শূন্য থেকে ৫০-এর মধ্যে থাকলে বায়ুর মানকে ‘ভালো’ বা নিখাদ বলে গণ্য করা হয়। ৫১ থেকে ১০০ স্কোর থাকলে তা ‘মাঝারি বা সহনীয়’ মানের বাতাস হিসেবে বিবেচিত হয়। কোনো শহরের স্কোর ১০১ থেকে ১৫০-এর ঘরে পৌঁছালে তা ‘সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর’ শ্রেণিভুক্ত হয়। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের তীব্র শারীরিক সমস্যা না হলেও শিশু, বৃদ্ধ, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং হৃদরোগ ও ফুসফুসের জটিলতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য চরম স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়।
অন্যদিকে, বায়ুদূষণ স্কোর ১৫১ থেকে ২০০-এর মধ্যে থাকলে বাতাসকে সরাসরি ‘অস্বাস্থ্যকর’ বলা হয়। কোনো নগরের দূষণ স্কোর ২০১ থেকে ৩০০-এর কোঠায় পৌঁছালে তা ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’ হিসেবে বিবেচিত হয়, যা সমগ্র জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে সূচকে স্কোর ৩০আই-এর ওপরে উঠে গেলে পরিস্থিতিকে ‘দুর্যোগপূর্ণ’ বা বিপজ্জনক বলে ঘোষণা করা হয়, যেখানে জরুরি স্বাস্থ্য সতর্কতা জারির বিধান রয়েছে।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকায় প্রতিনিয়ত বায়ুদূষণ বৃদ্ধির পেছনে বহুবিধ কারণ কাজ করছে। রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় অপরিকল্পিত ও ধুলোবালি নিয়ন্ত্রণহীন নির্মাণকাজ, ফিটনেসবিহীন পুরনো পরিবহন থেকে নির্গত বিষাক্ত কালো ধোঁয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ ইটভাটার ধোঁয়া এবং শিল্পকারখানার বর্জ্য বাতাসকে আশঙ্কাজনক হারে দূষিত করছে। পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে বাতাসের বেগ কম থাকা এবং মেগা প্রকল্পগুলোর কাজ চলাকালে নিয়মিত পানি না ছিটানোর ফলে বাতাসে বাতাসে অতিক্ষুদ্র কণার (পিএম ২.৫) পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের দূষিত বাতাসের মুখোমুখি হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নানাবিধ জটিল রোগব্যাধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাতাসে উপস্থিত রাসায়নিক ও অতিক্ষুদ্র কণা মানবদেহের শ্বাসনালীতে প্রবেশ করে হাপানি, ব্রঙ্কাইটিস, এলার্জি, অ্যালঝেইমার্স, হৃদরোগ এবং দীর্ঘমেয়াদে ফুসফুসের ক্যানসারের মতো মারাত্মক ব্যাধির জন্ম দিচ্ছে। বিশেষ করে শিশুরা বায়ুদূষণের কারণে কম ফুসফুসের কার্যক্ষমতা নিয়ে বড় হচ্ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণ পেতে অবিলম্বে কঠোর ও কার্যকর সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিচ্ছেন পরিবেশবিদরা। ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে দ্রুত সময়ের মধ্যে অনুমোদনহীন ইটভাটা বন্ধ করা, রাস্তার নির্মাণকাজে উপযুক্ত বেষ্টনী ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা এবং নিয়মিত বিরতিতে পানি ছিটানো নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করে কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযানে নামা এবং রাজধানী জুড়ে সবুজায়ন বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। টেকসই নগর পরিকল্পনা ও আইনের সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে ঢাকার বায়ুর মান আরও মারাত্মক বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হতে পারে।


