অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের আমদানি বাণিজ্য সহজ, আধুনিক ও গতিশীল করতে একগুচ্ছ নতুন নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন থেকে আমদানিতে শুধু ঋণপত্রের (এলসি) ওপর নির্ভর করতে হবে না। বিকল্প অর্থায়ন পদ্ধতি হিসেবে ডকুমেন্টারি কালেকশন, সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স ও সরাসরি ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির আওতায় পণ্য আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে আমদানি নথিপত্র ব্যবস্থাপনায় ইলেকট্রনিক পদ্ধতির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আগাম অর্থ পরিশোধের সীমা বাড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগ থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় আমদানি সংক্রান্ত গত এক বছরের বিভিন্ন সার্কুলার একত্র করে এ নতুন নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই জারির ফলে পূর্ববর্তী সব নির্দেশনা রহিত হবে এবং নতুন নীতিমালাটি আগামী এক বছর কার্যকর থাকবে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো এলসি ব্যতিরেক ‘ডকুমেন্টস এগেইনস্ট পেমেন্ট’ (ডিপি) এবং ‘ডকুমেন্টস এগেইনস্ট একসেপ্টেন্স’ (ডিএ) পদ্ধতিতে আমদানির সুযোগ দিতে পারবে। এ ছাড়া আমদানিকারক ও বিদেশি সরবরাহকারীর মধ্যে সরাসরি চুক্তির মাধ্যমেও লেনদেন করা যাবে, তবে উভয় ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে।
বাণিজ্যিক অর্থায়নে গতি আনতে ব্যাংকগুলোকে সাপ্লাই চেইন ফাইন্যান্স (এসসিএফ) চালু করতে উৎসাহিত করা হয়েছে। এর আওতায় বায়ার্স ক্রেডিট, সাপ্লায়ার ফাইন্যান্সিং এবং পেয়েবলস ফাইন্যান্সিং সুবিধা প্রদান করা যাবে। ভালো ঋণগ্রহীতাদের জন্য ইউজান্স আমদানিতে ব্যাংক নিজস্ব অর্থায়ন প্রদান করতে পারবে এবং বিল গ্রহণের পর তা সরবরাহকারীর কাছে ডিসকাউন্ট করার সুযোগ থাকবে। তবে এসব নতুন অর্থায়ন কাঠামো চালুর আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিকট ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও ঋণ মূল্যায়নের বিস্তারিত রূপরেখা জমা দিতে হবে।
আমদানি-রপ্তানি নীতিতে ডিজিটাল রূপান্তরের অংশ হিসেবে ইলেকট্রনিক ইনভয়েস ও ট্রান্সপোর্ট ডকুমেন্ট গ্রহণের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। পরীক্ষামূলকভাবে চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ‘ইলেকট্রনিক ট্রান্সফারেবল রেকর্ডস’ (ইটিআর)। যথাযথ যাচাই সাপেক্ষে এসব ডিজিটাল নথি আইনি বৈধতা পাবে, যা ভবিষ্যৎ বাণিজ্য সহজীকরণে ভূমিকা রাখবে।
বৈদেশিক মুদ্রা ছাড়করণের ক্ষেত্রে আগাম পেমেন্টের সীমা পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে। সাধারণ অনুমতির অধীনে রিপেমেন্ট গ্যারান্টি ছাড়া সর্বোচ্চ ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত অ্যাডভান্স পেমেন্ট পাঠানো যাবে। রপ্তানিকারকদের রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) অ্যাকাউন্ট থেকে এ সীমার পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে ৫০ হাজার ডলার। এর বেশি অর্থ পাঠাতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন প্রয়োজন হবে, যা আবেদন প্রাপ্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাণিজ্যিক অনিয়ম রোধে নজরদারি জোরদার করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ৩ মিলিয়ন ডলার বা তার বেশি মূল্যের আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে এলসি খোলার অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনলাইন ইম্পোর্ট মনিটরিং সিস্টেমে (ওআইএমএস) তথ্য তথ্য প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ব্যাংকগুলোকে আমদানিকৃত পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারদর এবং আমদানিকারক ও সরবরাহকারীর গ্রহণযোগ্যতা যাচাই করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রা প্রেরণের পর চার মাসের মধ্যে সংশিষ্ট ব্যাংকে ‘বিল অব এন্ট্রি’ জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক; ব্যর্থতায় সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকের নতুন এলসি খোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ হতে পারে।
বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ফ্রি ট্রেড জোনের (এফটিজেড) জন্য কনসাইনমেন্ট ভিত্তিতে পণ্য রাখার মেয়াদ নির্ধারিত হয়েছে ৪৮ থেকে ৬০ মাস। এর পাশাপাশি আমদানি বিল যথাসময়ে পরিশোধে বিলম্ব বা ব্যর্থতার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তার ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা নির্দিষ্ট করা হয়েছে, যা অমান্য করলে ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স বাতিলের মতো কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
মূলত বৈদেশিক মুদ্রা পাচার রোধ, পণ্যের ওভার-ইনভয়েসিং প্রতিরোধ এবং আমদানি প্রক্রিয়া সাশ্রয়ী ও দ্রুত করার লক্ষ্যেই বাণিজ্য ব্যবস্থার এই সার্বিক আধুনিকায়ন করা হয়েছে।


