সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে ৮ শ্রমিকের মৃত্যু, তদন্তের নির্দেশ

সীতাকুণ্ডে শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসের প্রভাবে ৮ শ্রমিকের মৃত্যু, তদন্তের নির্দেশ

অপরাধ ডেস্ক
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকায় ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ ভাঙার সময় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়ায় আট শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় আরও বেশ কয়েকজন শ্রমিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শুক্রবার সকালে ঘটা এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে সেনাবাহিনীর একটি বিশেষ ইউনিট মোতায়েন করা হয়েছে।
শুক্রবার বিকেলে চমেক হাসপাতালে হতাহতদের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং স্বজনদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথা জানান অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এই মর্মান্তিক ঘটনার নেপথ্যে কার গাফিলতি বা ত্রুটি ছিল, তা নিরূপণে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত করা হবে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, সরকার এখানে কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের পক্ষ বা বিপক্ষ অবলম্বন করবে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হচ্ছে ঘটনার সঠিক কারণ উদঘাটন করা এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা। সরকার তদন্তের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে।
শিপইয়ার্ডে নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্সের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে শিপব্রেকিং শিল্পে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ বা পরিবেশবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নে কঠোর নজরদারি বজায় রাখছে। গ্রিন ইয়ার্ডের সনদ প্রদান কোনো অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক হংকং কনভেনশনের নির্ধারিত নীতিমালা ও মানদণ্ডের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। কোনো প্রতিষ্ঠান ওই কনভেনশনের শর্তাবলি পূরণ করতে সক্ষম হলেই কেবল আন্তর্জাতিক সনদপ্রাপ্ত হয়। ফেরদৌস স্টিল শিপব্রেকিং ইয়ার্ডের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বা কমপ্লায়েন্সের কোনো ব্যত্যয় ছিল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার সকালে ভাটিয়ারী স্টেশন রোড এলাকায় অবস্থিত ওই শিপইয়ার্ডে শ্রমিকরা স্ক্র্যাপ জাহাজটি কাটার কাজ করছিলেন। একপর্যায়ে জাহাজের ভেতর থেকে তীব্র বিষাক্ত গ্যাস নির্গত হতে শুরু করে। এতে ঘটনাস্থলেই বেশ কয়েকজন শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে নেওয়ার পথে ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আটজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়।
দুর্ঘটনার পরপরই চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিসের বেশ কয়েকটি ইউনিট উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। তবে জাহাজের ভেতরে বিষাক্ত গ্যাসের ঘনত্ব অত্যন্ত বেশি হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে উদ্ধারকাজ বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং উদ্ধারকার্যে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসনের আহ্বানে সেনাবাহিনীর একটি ইউনিটকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেনাবাহিনী ও ফায়ার সার্ভিসের যৌথ প্রচেষ্টায় উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিপব্রেকিং শিল্পে জাহাজ কাটার আগে ‘গ্যাস ফ্রিং’ বা গ্যাসমুক্ত করার যে প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া অবলম্বন করার কথা, সেখানে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল কি না, তা তদন্তে উঠে আসা জরুরি। জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসের অস্তিত্ব শনাক্তে ব্যর্থতা বা অসতর্কতা বড় কোনো বিপর্যয়ের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আহতদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী। দুর্ঘটনার পর এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ফের নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি পক্ষ থেকে তদন্তের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সচেতন মহল মনে করছে, নিয়মিত তদারকি এবং নিরাপত্তা আইন যথাযথ প্রয়োগই এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ