জাতীয় ডেস্ক
সারাদেশের ৬৪টি জেলাতেই মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর বিস্তার ঘটেছে। বিশেষ করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা পিরোজপুরে সংক্রমণের হার অস্বাভাবিক রূপ নিয়েছে। ভৌগোলিক ও পরিবেশগত নানা কারণে সেখানে সংক্রমণ বাড়লেও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর স্থানীয় তৎপরতার ঘাটতিকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। সামগ্রিকভাবে রাজধানী ঢাকার বাইরে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে রোগী বৃদ্ধি পাওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) সর্বশেষ রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সম্প্রতি দেশের ছয়টি জেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা জেলাগুলো হলো—পিরোজপুর, ঝালকাঠি, খুলনা, বান্দরবান, ঢাকা ও ময়মনসিংহ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, স্থানীয় পর্যায়ে এডিস মশার লার্ভা বিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি হওয়ায় এসব জেলায় রোগী দ্রুত বাড়ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৬ আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে মোট ২৩ হাজার ৯৭৮ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন ৭০ জন। গত বছরের একই সময়ে মোট রোগীর সংখ্যা ছিল ২৫ হাজার ৯১২ জন এবং মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১০৪। যদিও সামগ্রিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত বছরের তুলনায় চলতি বছর রোগী ও মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কম, তবে সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী গতি উদ্বেগজনক।
মৌসুমভিত্তিক পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, মে মাসে সারাদেশে ৭১৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হলেও জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০৭ জনে। জুলাই মাসে সংক্রমণ তীব্র আকার ধারণ করে এবং ভর্তি রোগীর সংখ্যা পৌঁছায় ৯ হাজার ২০৬ জনে। চলতি আগস্ট মাসের প্রথম ১৬ দিনেই ৮ হাজার ৬৬৮ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কীটতত্ত্ববিদদের পূর্ব সতর্কবার্তা অনুযায়ী, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে অনুকূল আবহাওয়ার কারণে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরো বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে।
বিভাগওয়ারী বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরাবরের মতো এবারও ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বাধিক। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ এ বিভাগে মোট ৯ হাজার ৫৩৯ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। তবে ঢাকার বাইরে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ লক্ষ্য করা গেছে বরিশাল বিভাগে, যেখানে মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৩৫৯ জন। অন্যান্য বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগে ৩ হাজার ৯২২ জন, খুলনা বিভাগে ৩ হাজার ১৭৯ জন, ময়মনসিংহ বিভাগে ১ হাজার ১১১ জন, রাজশাহী বিভাগে ১ হাজার ৬৭ জন এবং রংপুর বিভাগে ৬৬৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন। সবচেয়ে কম রোগী শনাক্ত হয়েছে সিলেট বিভাগে, মোট ১৩৩ জন।
বরিশাল বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ছে পিরোজপুর জেলায়। কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত পিরোজপুরে ১ হাজার ১৫৯ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছেন এবং ১ জন মারা গেছেন। গত বছরের একই সময়ে এ জেলায় রোগীর সংখ্যা ছিল ৪৭৭ জন। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে জেলাটিতে সংক্রমণ দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় হাসপাতালগুলোতে শয্যার তুলনায় রোগীর চাপ বেশি থাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ জেলা পর্যায়ের প্রধান হাসপাতালগুলোতেও অতিরিক্ত রোগীর কারণে মেঝেতে শয্যা পেতে চিকিৎসা দিতে বাধ্য হচ্ছেন স্বাস্থ্যকর্মীরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দক্ষিণাঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং মানুষের জীবনযাত্রার ধরন এডিস মশার প্রজননে ভূমিকা রাখছে। পিরোজপুরসহ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ সুপেয় পানির প্রয়োজনে ব্যাপকভাবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করেন। এছাড়া ড্রেন ও নিচু জমিতে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার না করায় মশার লার্ভা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করছে। গত বছর বরগুনা জেলায় সংক্রমণ ব্যাপক রূপ নিলে প্রশাসনিক ও সামাজিক পর্যায়ে সমন্বিত মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছিল, যার সুফল এ বছর সেখানে দেখা যাচ্ছে। তবে পিরোজপুরে এ ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি ও নিধন কার্যক্রমে ঘাটতি ছিল।
জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা জানান, স্থানীয় পর্যায়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত লার্ভিসাইড প্রয়োগ এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি না করলে সংক্রমণের বিস্তার রোধ করা কঠিন। শুধুমাত্র রাজধানী কেন্দ্রিক মশক নিধন কর্মসূচি সীমাবদ্ধ না রেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এখনই সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি, অন্যথায় আগামী দিনগুলোতে ডেঙ্গুর ঝুঁকি অন্যান্য অঞ্চলেও মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।


