স্বাস্থ্য খাতের ১৭ বছরের অব্যবস্থাপনা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্য খাতের ১৭ বছরের অব্যবস্থাপনা রাতারাতি দূর করা সম্ভব নয়: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

জাতীয় ডেস্ক
সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর পেটে সার্জিক্যাল গজ রেখে সেলাই করার ঘটনায় প্রসূতির মৃত্যুর প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা নিয়ে কড়া মন্তব্য করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, গত ১৭ বছরে স্বাস্থ্যসেবা খাতে যে আস্থাহীনতা ও অব্যবস্থাপনা তৈরি হয়েছে, তা দুই-এক মাসের মধ্যে রাতারাতি দূর করা অসম্ভব। তবে এই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
শুক্রবার (২১ আগস্ট) সকালে রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামে নিহত প্রসূতি কনিকা মণ্ডলের বাড়ি পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় মন্ত্রীর সঙ্গে রাজবাড়ীর জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন, সিভিল সার্জন ডা. এস এম মাসুদসহ স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
গত ২৯ জুন ফরিদপুর শহরের ঝিলটুনির সমরিতা জেনারেল হাসপাতালে বালিয়াকান্দির বাসিন্দা অশান্ত মণ্ডলের স্ত্রী কনিকা মণ্ডল (৩৫) সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কন্যাসন্তান প্রসব করেন। চিকিৎসক লক্ষ্মী রানী দত্তের তত্ত্বাবধানে এই অপারেশন সম্পন্ন হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, অস্ত্রোপচারের পরপরই রোগীর পেট ফুলে যাওয়া ও তীব্র ব্যথার কথা পরিবার বারবার জানালেও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা তা আমলে নেননি। অবস্থার অবনতি হলে গত ৩ জুলাই তাকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে গত ৭ জুলাই পুনরায় অস্ত্রোপচার করে তার পেট থেকে একটি সার্জিক্যাল গজ অপসারণ করা হয়। দীর্ঘ প্রায় ৫১ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে গত ১৯ আগস্ট দিবাগত রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
এই মর্মান্তিক ঘটনার পর রাজবাড়ীর সিভিল সার্জনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। মন্ত্রী জানান, আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে কমিটিকে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর দায়ী চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্ট ক্লিনিকের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, এই ধরনের অবহেলা কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না এবং অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক ছাড় দেওয়া হবে না।
দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বাস্থ্য খাতের সংকট তুলে ধরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিগত বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে যত্রতত্র নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো হাসপাতাল ও ক্লিনিক গড়ে উঠেছে। যান্ত্রিক ও বাণিজ্যিক মানসিকতার এসব প্রতিষ্ঠান বর্তমানে সাধারণ মানুষের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে হলে সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রশাসনিক নজরদারি বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই খাতের প্রতিটি সমস্যা ধাপে ধাপে ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সমাধান করা হবে।
নিহত প্রসূতির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে মন্ত্রী সরকারের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে ৫০ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন। একই সঙ্গে এতিম শিশুটির সুচিকিৎসা ও পূর্ণ ভরণপোষণের যাবতীয় দায়িত্ব সরকার বহন করবে বলে পরিবারকে আশ্বস্ত করেন।
এদিকে, দেশজুড়ে কিডনি রোগীদের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য ও সম্প্রসারণের বিষয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অন্তত ৫০ শয্যা এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১০ শয্যা বিশিষ্ট কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন করা হবে। এসব জনগুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপনের প্রাথমিক কাজ দ্রুত শুরু করতে ইতিমধ্যেই সংশ্লিষ্ট দপ্তরের পক্ষ থেকে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে বিশেষায়িত চিকিৎসা সুবিধা পৌঁছে দিতে পারলে সাধারণ মানুষ অনেকাংশে উপকৃত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চিকিৎসা খাতে অবহেলার কারণে প্রাণহানির এমন ঘটনাগুলো জনমনে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। চিকিৎসা সেবা খাতের এই বিশৃঙ্খলা রোধে কঠোর নজরদারি, লাইসেন্স নবায়ন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করা এবং দায়িত্ব অবহেলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও বিশেষজ্ঞরা।
জাতীয় শীর্ষ সংবাদ