চীন-তুরস্ক-পাকিস্তানসহ চার দূতাবাসে চাঁদা দাবি করে হুমকি, নেপথ্যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের চক্রান্ত

চীন-তুরস্ক-পাকিস্তানসহ চার দূতাবাসে চাঁদা দাবি করে হুমকি, নেপথ্যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের চক্রান্ত

অপরাধ ডেস্ক
বাংলাদেশে অবস্থিত চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানসহ অন্তত চারটি বিদেশি দূতাবাস এবং দেশের কয়েকটি সরকারি দপ্তরে ই-মেইলযোগে চাঁদা দাবি ও নিরাপত্তা হুমকির ঘটনা ঘটেছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র ডিজিটাল মাধ্যম ব্যবহার করে কূটনৈতিক জোনকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে এই হুমকি পাঠিয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। ঘটনাটিকে কেবল সাধারণ চাঁদাবাজির প্রচেষ্টা হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও কূটনৈতিক অঙ্গনে আতঙ্ক সৃষ্টির চক্রান্ত হিসেবে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
রবিবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে এই তথ্য নিশ্চিত করেন। পরবর্তীতে গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) সূত্রে হুমকির শিকার হওয়া তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দূতাবাসের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়।
অপরাধের কৌশল ও আর্থিক মাধ্যম অপব্যবহার
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, সাইবারভিত্তিক অপরাধী চক্রটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ইন্টারনেটভিত্তিক বার্তা আদান-প্রদান ব্যবস্থার মাধ্যমে কূটনৈতিক মিশন এবং সরকারি দপ্তরগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক ই-মেইলে হুমকি বার্তা প্রেরণ করে। বার্তায় সুনির্দিষ্ট অংকের অর্থ বা চাঁদা দাবি করা হয় এবং অর্থ পরিশোধের জন্য মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বিশেষত বিকাশ অ্যাকাউন্ট নম্বর সংযুক্ত করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ তথ্য। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানতে পেরেছেন, ই-মেইলে ব্যবহৃত মোবাইল ব্যাংকিং নম্বরগুলো মূলত সাধারণ ও নিরীহ নাগরিকদের। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানেনই না যে তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে নিবন্ধিত অ্যাকাউন্ট নম্বর এই ধরনের রাষ্ট্রীয় ও কূটনৈতিক স্পর্শকাতর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে চক্রটি মূল অপরাধীদের আড়াল করার পাশাপাশি নিরপরাধ নাগরিকদের আইনি জটিলতায় ফেলার দ্বিমুখী কৌশল অবলম্বন করেছে।
সম্ভাব্য উদ্দেশ্য ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণ
ডিবি প্রধান সংবাদ সম্মেলনে উল্লেখ করেন, ঘটনাটির সামগ্রিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে এটি কেবল আর্থিক সুবিধা আদায়ের সাধারণ চাঁদাবাজি নয়। এর পেছনে বহুমুখী উদ্দেশ্য কাজ করতে পারে। তদন্তকারী সংস্থাগুলো প্রাথমিকভাবে তিনটি প্রধান দিক খতিয়ে দেখছে:
  • কূটনৈতিক অঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি: বিদেশি রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক ও বিদেশি মিশনগুলোর মধ্যে ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করা।
  • দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা: বাংলাদেশে বিদেশি কূটনীতিক ও বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি তৈরি এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন সৃষ্টি করা।
  • ব্যক্তিগত শত্রুতা ও ব্ল্যাকমেইলিং: ব্যবহৃত বিকাশ অ্যাকাউন্টগুলোর প্রকৃত গ্রাহকদের বিরুদ্ধে শত্রুতার জের ধরে তাদের ফাঁসানো বা সামাজিক ও আইনিভাবে হয়রানি করা।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও চলমান তদন্ত
কূটনৈতিক এলাকার নিরাপত্তা সব সময়ই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়। এই ধরনের সমন্বিত হুমকি আসার পরপরই রাজধানীর কূটনৈতিক জোনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে। গুলশান ও বারিধারা কূটনৈতিক এলাকায় টহল বৃদ্ধি এবং গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
একই সাথে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ ই-মেইলগুলোর আইপি অ্যাড্রেস, রাউটিং ট্রেইল এবং সার্ভারের অবস্থান শনাক্ত করতে ডিজিটাল ফরেনসিক অনুসন্ধান চালাচ্ছে। জড়িত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারে বিশেষ দল কাজ করছে বলে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অপরাধী চক্র দেশীয় বা আন্তর্জাতিক যেখানেই অবস্থান করুক না কেন, প্রযুক্তিগত সহায়তায় তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
আইন আদালত শীর্ষ সংবাদ