বাংলাদেশ ডেস্ক
বাংলাদেশ সরকারের চলমান আইনি ও বিচারিক সংস্কার এবং সংবিধান সংশোধনসহ সার্বিক সংস্কার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ সহযোগিতা প্রদানে গভীর আগ্রহ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজ অফিসকক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এই সহযোগিতার কথা জানান সংস্থাটির প্রতিনিধিদল। বৈঠকে সাংবিধানিক সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সহায়তা প্রদান, পুলিশের পেশাগত সামর্থ্য বৃদ্ধি, গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধ, প্রস্তাবিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন প্রণয়ন এবং গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনসহ বিভিন্ন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বৈঠকে ইউএনডিপি বাংলাদেশের আবাসিক প্রতিনিধি বর্তমান সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্য, অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়নে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। এ সময় তিনি সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটির সভাপতি হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় কারিগরি ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা প্রদানের প্রস্তাব দেন। জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে ইউএনডিপির দীর্ঘদিনের ধারাবাহিক সহায়তার ভূয়সী প্রশংসা করেন এবং আগামী দিনে এই অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার আহ্বান জানান।
বৈঠকে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার নাগরিকদের অর্থাৎ রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। ইউএনডিপির পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, ক্যাম্প এলাকায় পরিবেশ সুরক্ষা বিশেষ করে পাহাড় ধস প্রতিরোধ এবং স্থানীয় ও ক্যাম্পভিত্তিক সামাজিক উন্নয়নমূলক নানা কার্যক্রমের মাধ্যমে বাস্তুচ্যুত এই জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে সংস্থাটি কাজ করে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট মত প্রকাশ করে জানান যে, সরকার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্তমান অবকাঠামোর যথোপযুক্ত উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন চায়, তবে দেশের বৃহত্তর স্বার্থ ও নিরাপত্তা বিবেচনায় সেখানে নতুন করে কোনো স্থায়ী অবকাঠামো বা স্থাপনা নির্মাণ করা সমীচীন হবে না।
পাশাপাশি, বাংলাদেশ পুলিশের পেশাগত দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইউএনডিপির চলমান সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। আবাসিক প্রতিনিধি জানান যে, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ, দ্বন্দ্ব নিরসন এবং সংঘাত এড়ানোর মতো বিভিন্ন সংবেদনশীল বিষয়ে পুলিশ বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পুলিশের দক্ষতা বাড়াতে এই ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতাকে সাধুবাদ জানান। বর্তমান ডিজিটাল যুগে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও বৈঠকে গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পায়। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিভিন্ন ধরনের গুজব, অপতথ্য ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়ানোর প্রবণতা রোধে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করার কথা জানিয়েছে ইউএনডিপি। এ ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে সংস্থাটি জানায়, কোনো নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে যাতে দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে তারা কাজ করছে। জবাবে মন্ত্রী উল্লেখ করেন যে, সাইবার সুরক্ষা আইন ইতোমধ্যে পাস হয়েছে এবং এই আইনের সফল ও কার্যকর বাস্তবায়নে ইউএনডিপি প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করতে পারে।
মানবাধিকার সংরক্ষণ ও আইনি কাঠামোর বিষয়ে বৈঠকে জানানো হয় যে, প্রস্তাবিত ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’-এর খসড়া ইতিমধ্যে মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন লাভ করেছে এবং এটি জাতীয় সংসদের আসন্ন অধিবেশনে পাস হবে বলে আশা করা যাচ্ছে। এই আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় ইউএনডিপি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিদেশি মিশন, উন্নয়ন অংশীদার, গণমাধ্যমের সম্পাদক এবং অভিজ্ঞ আইনজীবীদের মতো সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের মতামত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। এছাড়া দেশের সামাজিক মনস্তত্ত্ব ও ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে একটি যুগোপযোগী ও গ্রহণযোগ্য আইন প্রণয়নের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। বর্তমান সরকারের আমলে মানবাধিকার সুরক্ষার বিষয়টি অগ্রাধিকার পাচ্ছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশের ভাবমূর্তি তুলে ধরার বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি বলেন যে, অনেক সময় আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বাংলাদেশের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ চিত্র সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয় না। বাংলাদেশ একটি উদারপন্থী ও ধর্মীয় সম্প্রীতিপূর্ণ দেশ হিসেবে বিশ্বে পরিচিত এবং দেশের এই ইতিবাচক ভাবমূর্তি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে ইউএনডিপি সবসময় ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে আগ্রহী। বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক ও বহিরাগমন অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব, রাজনৈতিক অধিশাখার যুগ্মসচিব এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।


