মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে নয়াদিল্লি-তেহরান বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নাকচ করলেন মার্কো রুবিও

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখে নয়াদিল্লি-তেহরান বাণিজ্য চুক্তির সম্ভাবনা নাকচ করলেন মার্কো রুবিও

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মধ্যকার বৈঠকের পর নয়াদিল্লি ও তেহরানের মধ্যে নতুন কোনো বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। সম্প্রতি এক গণমাধ্যম সাক্ষাতকারে তিনি এই মন্তব্য করেন। মার্কিন প্রশাসনের শীর্ষ এই কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতি এবং ওয়াশিংটনের কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার বাস্তবতায় ভারতের পক্ষে ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের কোনো অর্থনৈতিক চুক্তিতে যাওয়া কূটনৈতিক ও কৌশলগতভাবে অত্যন্ত দুরূহ।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, দ্য ব্রায়ান কিলমিড শো-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কো রুবিও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি জানান, প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ ও পররাষ্ট্রনীতির রূপরেখা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। তবে তেহরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভিন্ন মাত্রার যোগাযোগ বজায় থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সঙ্গে ইরানের দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের কথা তিনি স্মরণ করিয়ে দেন। বর্তমান মার্কিন প্রশাসনের নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার করে রুবিও বলেন, তেহরানের ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক ও একতরফা নিষেধাজ্ঞা এড়াতে কোনো রাষ্ট্র যদি ইরানকে সহযোগিতা করে, তবে ওয়াশিংটন সেই রাষ্ট্রগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্বঘোষিত হুশিয়ারি পুনর্ব্যক্ত করে রুবিও স্পষ্ট ভাষায় জানান, যেসব দেশ বা পক্ষ তেহরানকে অর্থ উপার্জনের পথ তৈরি করে দেবে কিংবা পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নে সহায়তা করবে, তাদের ওপরও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রয়োগ করা হবে। ট্রাম্প প্রশাসনের মূল এবং অপরিবর্তিত কৌশলগত লক্ষ্য হলো—ইরানকে যেকোনো মূল্যে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথ থেকে বিরত রাখা। এই লক্ষ্য অর্জনে ওয়াশিংটন বর্তমানে প্রধানত বহুমুখী অর্থনৈতিক ও কূটনৈমিতিক চাপ প্রয়োগের ওপর জোর দিচ্ছে। তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার স্বার্থে প্রয়োজনে যেকোনো সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার পূর্ণ অধিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সংরক্ষণ করে বলেও তিনি কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এই মন্তব্য দক্ষিণ এশিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গেই বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক অবস্থান এবং অর্থনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে এ ধরনের আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। নয়াদিল্লির ওপর ওয়াশিংটনের এই পরোক্ষ কূটনৈতিক চাপ প্রমাণ করে যে, বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর বাণিজ্য ও বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং নিরাপত্তা সমীকরণগুলো অত্যন্ত কঠোরভাবে অনুসৃত হচ্ছে।
উল্লেখ্য, গত কয়েক মাস ধরে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সামরিক ও রাজনৈতিক উত্তেজনা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। দুই দেশের এই বৈরিতা ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলমান থাকার প্রেক্ষাপটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন বাহিনীর রাত্রিকালীন সুনির্দিষ্ট সামরিক হামলার বিষয়টি জনসমক্ষে স্বীকার করেন এবং প্রয়োজনে আরও বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দেন। এর পাল্টা জবাবে ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মহসিন রেজাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন যে, তেহরানের নতুন কৌশলগত পদক্ষেপসমূহ ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ভিত্তিকে চরমভাবে নাড়া দেবে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহের নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের রুটগুলোতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল দেশগুলো নিজেদের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের সুরক্ষায় অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কূটনৈতিক পদক্ষেপ পরিচালনা করছে। মার্কিন প্রশাসনের এই নতুন কড়াকড়ি বিশ্ব অর্থনীতি ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন কোনো মেরুকরণ তৈরি করে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ