আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে দেশটির বিদ্যুৎ গ্রিডে সম্ভাব্য হামলার সময়সীমা পুনরায় স্থগিত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সর্বশেষ ঘোষণায় এই সময়সীমা আরও ১০ দিন বাড়িয়ে আগামী ৬ এপ্রিল পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে নেওয়া হয়েছে, যখন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানান, ইরানের অনুরোধে এই সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে এবং আলোচনার অগ্রগতি ইতিবাচক। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো আলোচনার বিষয় অস্বীকার করা হয়েছে। ফলে দুই পক্ষের অবস্থানের মধ্যে স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছে হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করার জন্য। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে প্রণালীটি কার্যত অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতিতে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু না হলে ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ওপর হামলা চালানো হবে। প্রথমে ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও পরে তা পাঁচ দিন বাড়ানো হয়। সর্বশেষ সিদ্ধান্তে এটি দ্বিতীয়বারের মতো আরও সম্প্রসারিত হলো। এতে ধারণা করা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র একদিকে সামরিক চাপ বজায় রাখলেও অন্যদিকে কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ খোলা রাখছে।
তবে সম্ভাব্য এই হামলা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা প্রকাশ করেছে যে, বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের শামিল হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ বেসামরিক স্থাপনায় আঘাত হানলে তা সরাসরি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় গুরুতর প্রভাব ফেলবে এবং মানবিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে সামরিক অভিযান চালানো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যদি না তা সরাসরি সামরিক প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
বর্তমান সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে ২৮ ফেব্রুয়ারি, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের ওপর সামরিক হামলা চালায়। এরপর থেকে দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হুমকি, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক প্রস্তুতি পরিস্থিতিকে ক্রমশ অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর কোনো ধরনের হামলা চালানো হলে তা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে এবং পুরো অঞ্চলে পাল্টা আক্রমণ বৃদ্ধি পেতে পারে। এতে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে আলোচনার অগ্রগতির দাবি এবং অন্যদিকে সামরিক হুমকি—এই দ্বৈত অবস্থান পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে। পাশাপাশি সম্ভাব্য স্থল অভিযানের আলোচনা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে, যা বাস্তবায়িত হলে সংঘাতের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে।
এদিকে চলমান সংঘাতে ইতোমধ্যে হাজারের বেশি মানুষের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে। অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিতিশীলতা বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে চলমান এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতি, বিশেষ করে জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।


