কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে লবণের সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি: একটি পর্যালোচনা

কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে লবণের সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি: একটি পর্যালোচনা

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

সদ্য সমাপ্ত ঈদুল আজহায় সারাদেশে এক কোটিরও বেশি পশু কোরবানি হয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ পশুর কাঁচা চামড়া সঠিকভাবে সংরক্ষণের জন্য দেশব্যাপী লবণের ব্যাপক চাহিদা তৈরি হয়। সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী, এবারের কোরবানির চামড়া সংরক্ষণে লবণের মোট চাহিদা ছিল প্রায় ৬০ হাজার টন। এই চাহিদার বিপরীতে চামড়া সুরক্ষায় দেশের মাদরাসা ও এতিমখানাগুলোতে বিনামূল্যে লবণের একটি অংশ সরবরাহ করেছে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। তবে সরকারি এই উদ্যোগ সত্ত্বেও ঈদের মৌসুমে দেশের বাজারে লবণের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাওয়ায় সাধারণ ও মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীরা কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ চামড়া সংগ্রহ এবং সংরক্ষণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।

প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, এ বছর দেশে মোট ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৪টি পশু কোরবানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এই বিপুলসংখ্যক পশুর চামড়া পচন থেকে রক্ষা করতে লবণের সার্বিক চাহিদা ধরা হয়েছিল ৫৯ হাজার ৫৯০ টন। কাঁচা চামড়ার গুণগত মান বজায় রাখতে লবণ একটি অপরিহার্য উপাদান। চামড়া ছাড়ানোর পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যাপ্ত লবণ না দিলে তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, যা দেশের চামড়া শিল্পের জন্য বড় আর্থিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। এই ঝুঁকি এড়াতে এবং মাঠপর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণ ব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করতে বিসিকের পক্ষ থেকে জেলাভিত্তিক ৯ হাজার ৮১৯ টন লবণ বিনামূল্যে বিতরণের বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চাহিদা এবং বরাদ্দ পাওয়া মিলগুলোর সরবরাহ সক্ষমতার তারতম্যের কারণে শেষ পর্যন্ত ৯ হাজার ৪৬৩ টন লবণ বিতরণ করা সম্ভব হয়েছে, যা মোট চাহিদার প্রায় ১৬ শতাংশ।

বিসিকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঈদুল আজহার পূর্বে দেশব্যাপী চামড়া সংরক্ষণ শতভাগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে লবণ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও মিলগুলোতে বিশেষ জরিপ পরিচালনা করা হয়। সেই জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ঈদের আগে দেশের ৬৪টি জেলায় লবণের মোট মজুদের পরিমাণ ছিল ৮৯ Danger ৩৯৪ টন। গাণিতিক হিসাবে এই মজুদের পরিমাণ চাহিদার চেয়ে অনেক বেশি থাকায় কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণে লবণের কোনো ধরনের ঘাটতি হওয়ার সুযোগ ছিল না। তা সত্ত্বেও বিশেষ করে ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান যেমন এতিমখানা, মসজিদ ও মাদরাসাগুলোর মাধ্যমে সংগৃহীত চামড়া যেন লবণের অভাবে নষ্ট না হয়, সেজন্য মাঠ প্রশাসনের চাহিদা অনুযায়ী ঈদের একদিন আগেই বিনামূল্যে লবণ বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা হয়। এটি ছিল বিসিকের পক্ষ থেকে দ্বিতীয়বারের মতো এমন উদ্যোগ। এই কার্যক্রমের জন্য সংস্থাটি ১৭ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয় এবং চামড়া সংরক্ষণের বিশেষ প্রশিক্ষণ খাতে আরও ২ কোটি ৬৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় করা হয়।

বিভাগীয় পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিনামূল্যে বিতরণের এই লবণের সিংহভাগ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে। ঢাকা বিভাগে ২ হাজার ৪০৪ দশমিক ২৪ টন এবং চট্টগ্রাম বিভাগে ২ হাজার ৩২৯ দশমিক ৮০ টন লবণ বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া অন্যান্য বিভাগের মধ্যে সিলেটে ৭৫০ টন, খুলনায় ১ হাজার ৪৭ দশমিক ৫০ টন, রাজশাহীতে ১ হাজার ৮৬ দশমিক ৪৭ টন, রংপুরে ৮৮৫ টন, বরিশালে ৬১৩ টন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৩৪৭ টন লবণ সরবরাহ করা হয়।

উল্লেখ্য, গত বছর প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী বিনামূল্যে লবণ বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বিসিক। সে বছর ৩০ হাজার টনের প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও মাঠ প্রশাসনের তালিকা অনুযায়ী ১১ Style ৫৭১ টন লবণ সরবরাহ করা হয়েছিল। গতবারের ২০ কোটি টাকার বরাদ্দের তুলনায় এবার উৎপাদন হ্রাস পাওয়ায় এবং সামগ্রিক বাজারমূল্য বৃদ্ধির কারণে একই পরিমাণ বাজেটে বিতরণের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৭৫২ টন হ্রাস পেয়ে ৯ হাজার ৮১৯ টনে নেমে আসে।

সরকারিভাবে মজুদের সপক্ষে যুক্তি দেওয়া হলেও মাঠপর্যায়ের কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন। চামড়া ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ঈদের মাত্র দুই মাস আগেও দেশের লবণের বাজার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে লবণের মূল্য হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হয়। ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি সহায়তায় বিনামূল্যে লবণ পেলেও সাধারণ এবং মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বাজার থেকে চড়া মূল্যে নগদ অর্থে লবণ কিনতে হয়েছে। মূল্যের এই আকস্মিক উল্লম্ফনের কারণে অনেক ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ী প্রয়োজনীয় পরিমাণে লবণ কিনতে পারেননি। ফলে পর্যাপ্ত লবণের অভাবে কাঁচা চামড়ার গুণগত মান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা রপ্তানি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ব্যবসায়ীরা এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ঈদের পূর্বে ও পরে লবণের বাজারে কঠোর মনিটরিং এবং নজরদারি জোরদার করার দাবি জানিয়েছেন।

লবণের এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির পেছনে মূলত উৎপাদন ব্যাহত হওয়াকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিসিক। চলতি বছরে দেশে লবণ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২৫ লাখ ২২ হাজার টন। তবে মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে ১৮ লাখ টনের কিছু বেশি। মৌসুমের শেষভাগে আগাম বৃষ্টিপাত এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে মাঠপর্যায়ে লবণ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। সরবরাহ লাইনে এই ঘাটতির প্রভাব সরাসরি গিয়ে পড়ে মিল ও পাইকারি বাজারে। ফলে ঈদের চামড়া সংরক্ষণের মূল সময়ে লবণের বাজারে এক ধরনের কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক সংকট তৈরি হয়, যার চাপ সামলাতে হয়েছে মাঠপর্যায়ের প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের। চামড়া শিল্পের মতো একটি সম্ভাবনাময় জাতীয় সম্পদের সুরক্ষায় আগামী দিনে লবণের সরবরাহ ও বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখতে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নীতিমালার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাত বিশেষজ্ঞরা।

সৌজন্যে: বণিক বার্তা

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ