অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক মন্দার নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দেশের কোরবানির পশুর বাজারে। নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পাওয়ায় চলতি বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পশু কোরবানি অনেক কম হয়েছে। ফলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাক্কলিত চাহিদার একটি বড় অংশই অবিক্রীত থেকে গেছে। মাঠপর্যায়ে বিপুল পরিমাণ কোরবানিযোগ্য পশু উদ্বৃত্ত থাকায় খামারি, প্রান্তিক চাষী ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও খাতসংশ্লিষ্টদের প্রাক্কলন অনুযায়ী, সরকারের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় এবার দেশে অন্তত ১০ লাখ কম পশু কোরবানি হয়েছে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন এবং পশুখাদ্যের আকাশচুম্বী দামের কারণে উৎপাদন ব্যয় বাড়ায় সামগ্রিকভাবে পশুর দামও ছিল চড়া, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নাগালের বাইরে চলে যায়।
প্রতি বছর ঈদের পর কোরবানি হওয়া পশুর পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। তবে চলতি বছর মাঠপর্যায় থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজ এখনো শেষ না হওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। অধিদপ্তর জানিয়েছে, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী চলতি সপ্তাহের মধ্যে এই তালিকা চূড়ান্ত করা হবে। তবে দেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের প্রাথমিক উপাত্ত এবং মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে, প্রায় সব অঞ্চলেই পশু বিক্রির পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এবার দেশে কোরবানিযোগ্য পশুর মজুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি। এর বিপরীতে অভ্যন্তরীণ চাহিদা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি। সরকারি প্রাক্কলন অনুযায়ী ২২ লাখ ২৭ হাজারের বেশি পশু উদ্বৃত্ত থাকার কথা থাকলেও, মাঠপর্যায়ের চিত্র বলছে অবিক্রীত পশুর এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
আঞ্চলিক উপাত্ত বিশ্লেষণে দেখা যায়, ময়মনসিংহ বিভাগে এবার ৪ লাখ ৪০ হাজার পশুর চাহিদার বিপরীতে প্রাথমিকভাবে আনুমানিক ৩ লাখ ৭০ হাজার পশু কোরবানি হয়েছে, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ১৩ হাজার কম। ময়মনসিংহ জেলায় ১ লাখ ৮০ হাজার চাহিদার বিপরীতে কোরবানি হয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার পশু, অথচ সেখানে কোরবানিযোগ্য পশু প্রস্তুত ছিল ২ লাখ ২৬ হাজার। খুলনা বিভাগে ১০ লাখের বেশি পশুর চাহিদার বিপরীতে কোরবানি হয়েছে ৮ লাখ ৪৬ হাজার ৫টি। বিভাগটিতে এবার ১৪ লাখ ৪৬ হাজার কোরবানিযোগ্য পশু মজুত ছিল। রংপুর জেলায় ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৯৬টি চাহিদার বিপরীতে কোরবানি হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৬ হাজার পশু। চট্টগ্রামেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে পশু কোরবানি কম হওয়ার তথ্য মিলেছে। কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির হিসাব অনুযায়ী, চট্টগ্রাম মহানগর ও উপজেলায় ৪ লাখ ১১ হাজার ৪৪০টি চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে, এবং বিক্রি করতে না পেরে বিপুল পরিমাণ চামড়া সড়ক ও ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বগুড়া জেলাতেও কোরবানির পশুর পূর্ণাঙ্গ তথ্য চূড়ান্ত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ও বাজার বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সেই অনুপাতে সাধারণ মানুষের আয় বা মজুরি বাড়েনি। ফলে ভোক্তারা তাদের জমানো অর্থ ব্যয়ে অতিরিক্ত সতর্ক ও হিসাব-নিকাশ করছেন। আর্থিক চাপের কারণে অনেকেই এবার এককভাবে বা বড় পশু কোরবানি না দিয়ে যৌথভাবে বা ভাগে কোরবানি দিয়েছেন। আবার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এবার কোরবানি দেওয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে বাধ্য হয়েছেন। বাজারে তুলনামূলকভাবে মাঝারি ও ছোট আকারের গরুর চাহিদা বেশি থাকলেও সামগ্রিক কেনাবেচায় মন্দাভাব কাটেনি।
বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক মহাপরিচালক ও কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, পশুখাদ্য এবং ওষুধের উচ্চমূল্যের কারণে এবার প্রতি কেজি মাংসের উৎপাদন ব্যয় গড়ে ১ হাজার ২০০ থেকে ১Style হাজার ৩০০ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে। ব্যয়বৃদ্ধির এই চাপ একদিকে যেমন খামারিদের মুনাফা কমিয়েছে, অন্যদিকে চড়া দামের কারণে ক্রেতাদের বাজারবিমুখ করেছে। গত বছর দেশে ৯১ লাখের কিছু বেশি পশু কোরবানি হলেও, অর্থনৈতিক সংকটের ধারাবাহিকতায় এবার সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের গ্রামীণ অর্থনীতি ও পশুপালন খাতের জন্য একটি বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌজন্যে: বণিক বার্তা


