যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ব্যর্থতা: ইরান সংঘাতের পর বৈশ্বিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার দাবি

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ব্যর্থতা: ইরান সংঘাতের পর বৈশ্বিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার দাবি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সামরিক সংঘাতের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও কৌশলগত অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র আগের চেয়ে অনেক বেশি দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘দ্য সুফান সেন্টার’-এর নির্বাহী পরিচালক কলিন ক্লার্ক। তার মতে, ওয়াশিংটনের বর্তমান প্রশাসন উদ্ভূত পরিস্থিতির গভীরতা এবং এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছে না, যা মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির একটি বড় ব্যর্থতা।

সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া এক বিশ্লেষণে কলিন ক্লার্ক উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সর্বোচ্চ নেতার স্তরে তুলনামূলকভাবে আরও কঠোর অবস্থানধারী এবং ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) সংশ্লিষ্ট তরুণ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের কৌশলগত চাপ প্রয়োগের নীতি কার্যকারিতা হারাচ্ছে এবং তেহরানের মনোভাব আরও রক্ষণাত্মক ও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই সংঘাতের সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথ হরমুজ প্রণালীতে। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল এই প্রণালীটি কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যে স্থবিরতা নেমে এসেছে। বিশ্ববাজারে দৈনিক অপরিশোধিত তেল সরবরাহের একটি বড় অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অচলাবস্থা বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

পাশাপাশি, এই সংঘাতের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ পেয়েছে। বিশ্লেষকদের দাবি, ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার পারদ বজায় রাখতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহার করতে হয়েছে। এর ফলে মার্কিন সামরিক মজুতে যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা বিশ্বের অন্য কোনো অঞ্চলে—বিশেষ করে এশিয়া-প্যাসিফিক বা পূর্ব ইউরোপে—প্রয়োজনীয় সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে দেবে।

কৌশলগত এই সংকটের বাইরেও পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন কলিন ক্লার্ক। তিনি অভিযোগ করেন, ওয়াশিংটন এই সংকটের সময়ে তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের সঙ্গে পর্যাপ্ত সমন্বয় করেনি এবং কূটনৈতিক ক্ষেত্রে তাদের অবমূল্যায়ন করেছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর উদ্বেগকে উপেক্ষা করা এবং তাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় পরামর্শ না করেই একতরফা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নীতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। পরবর্তীতে নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করার কার্যক্রমে ইউরোপীয়দের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানানোকে একটি স্ববিরোধী নীতি হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

সার্বক্ষণিকভাবে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ার এই প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এক থেকে দুই বছর আগের অবস্থানের তুলনায় বর্তমান অবস্থান অনেকটাই দুর্বল। এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকেই হুমকিতে ফেলছে না, বরং বৈশ্বিক পরাশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা ও কার্যকারিতাকেও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ