বিনোদন ডেস্ক
চলচ্চিত্রকার রায়হান রাফি পরিচালিত নতুন চলচ্চিত্র ‘প্রেশার কুকার’ সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় প্রদর্শিত হয়েছে। শহুরে জীবনের সামাজিক চাপ, বিশেষ করে নারীদের জীবনসংগ্রাম ও মানসিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি মুক্তির পর থেকেই আলোচনার জন্ম দিয়েছে। চলচ্চিত্রটির নাম ও বিষয়বস্তুর মধ্যে প্রতীকী সম্পর্ক এবং সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার উপস্থাপন দর্শক ও সমালোচকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। নারী জীবনের বিভিন্ন স্তরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার কারণে এটি সমকালীন বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের আলোচিত একটি কাজ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
চলচ্চিত্রটির মূল কাহিনি আবর্তিত হয়েছে শহরের চারটি ভিন্ন আর্থসামাজিক শ্রেণির নারীদের জীবনকে কেন্দ্র করে—নিম্নবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত। প্রতিটি স্তরের নারীর জীবনসংগ্রাম, পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক চাপ এবং ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার ভিন্ন ভিন্ন দিক এখানে তুলে ধরা হয়েছে। বিশেষভাবে নিম্নবিত্ত নারী রেশমাকে কেন্দ্র করে গল্পের মূল ধারা এগিয়েছে, যেখানে তার জীবনসংগ্রাম, টিকে থাকার লড়াই এবং সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংঘাত চলচ্চিত্রের কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠেছে। ‘প্রেশার কুকার’ নামটি প্রতীকীভাবে নারীদের ওপর সামাজিক চাপ ও সীমাবদ্ধতার ইঙ্গিত বহন করে, যা চলচ্চিত্রজুড়ে বিভিন্ন ঘটনার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।
চলচ্চিত্রটিতে সংলাপ উপস্থাপনে বাস্তবধর্মী ও কঠোর ভাষার ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়, যা চরিত্রগুলোর সামাজিক অবস্থান ও আবেগের গভীরতাকে তুলে ধরতে ব্যবহৃত হয়েছে। নির্মাতা শহুরে জীবনের কিছু কঠিন বাস্তবতা ও সম্পর্কের টানাপোড়েনকে নির্দ্বিধায় উপস্থাপন করেছেন, যা কিছু দর্শকের কাছে স্বাভাবিক বাস্তবতার প্রতিফলন হিসেবে ধরা পড়লেও, কিছু ক্ষেত্রে এটি প্রচলিত রুচি ও পারিবারিক দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মনে করা হতে পারে। চলচ্চিত্রটি নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, পারিবারিক কাঠামো এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে।
‘প্রেশার কুকার’ চলচ্চিত্রটি প্রয়াত নির্মাতা তারেক মাসুদের প্রতি উৎসর্গ করা হয়েছে। চলচ্চিত্রের উপস্থাপনায় এবং বিষয়বস্তুর গভীরতায় তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রভাষার প্রভাব নিয়ে আলোচনা দেখা যায়। বিশেষ করে তার নির্মিত ‘মাটির ময়না’ চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার যে চিত্র উঠে এসেছিল, সেই ধারার সঙ্গে এই চলচ্চিত্রের কিছু প্রতীকী সংযোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। চলচ্চিত্র ইতিহাসে তারেক মাসুদের অবদান এবং সমকালীন চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ওপর তার প্রভাব এই প্রেক্ষাপটে পুনরায় আলোচনায় এসেছে।
অস্ট্রেলিয়ায় চলচ্চিত্রটির প্রদর্শন উপলক্ষে প্রবাসী দর্শকদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি চলচ্চিত্রের উপস্থিতি এবং প্রবাসী দর্শকদের সঙ্গে সাংস্কৃতিক সংযোগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ ধরনের প্রদর্শনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। প্রযোজনা সংস্থা পাথ প্রোডাকশন অস্ট্রেলিয়ায় চলচ্চিত্রটি প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে বলে জানা গেছে, যার মাধ্যমে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশি দর্শকরা সমকালীন দেশীয় চলচ্চিত্র উপভোগের সুযোগ পান।
চলচ্চিত্রে অভিনয়শিল্পীদের মধ্যে নাজিফা তুষির অভিনয় বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। নিম্নবিত্ত নারী চরিত্র রেশমার ভূমিকায় তার অভিনয় চরিত্রটির আবেগ, সংগ্রাম ও বাস্তবতার সঙ্গে মানানসইভাবে উপস্থাপিত হয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। চরিত্রের দৈনন্দিন জীবনযাপন, মানসিক দ্বন্দ্ব এবং সামাজিক চাপের মধ্যেও টিকে থাকার চিত্রায়ণ চলচ্চিত্রের কাহিনিকে আরও বাস্তবধর্মী করেছে।
সমালোচকদের মতে, ‘প্রেশার কুকার’ চলচ্চিত্রটি শহুরে নারীদের জীবনে বিদ্যমান সামাজিক চাপ, পারিবারিক প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি সমকালীন উপস্থাপনা। চলচ্চিত্রটি দেখায় যে সমাজের ভিন্ন ভিন্ন স্তরের নারীরা আলাদা পরিস্থিতিতে থাকলেও তাদের ওপর সামাজিক চাপের প্রকৃতি অনেক ক্ষেত্রেই মিল রয়েছে। এই বাস্তবতা নতুন প্রজন্মের দর্শকদের জন্য চিন্তার খোরাক তৈরি করতে পারে এবং সমাজে বিদ্যমান লিঙ্গভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে নতুন করে আলোচনা উসকে দিতে পারে।


