অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
বাংলাদেশের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহের অন্যতম প্রধান উৎস একটি ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট (এফএসআরইউ) কারিগরি ত্রুটির কারণে কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চলগুলোতে।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির জনসংযোগ শাখা থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কারিগরি সমস্যার কারণে একটি এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে তিতাসের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকায় গ্যাসের স্বল্পচাপ জনিত সমস্যা দেখা দিয়েছে।
প্রভাবিত এলাকা ও জনজীবন
তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, সরবরাহ হ্রাসের কারণে দেশের বৃহত্তম শিল্প ও আবাসিক জোনের একটি বড় অংশে গ্যাস সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁ, মেঘনা ঘাট, গজারিয়াসহ ঢাকা দক্ষিণ ও মহানগরীর বিশাল এলাকায় দিনভর গ্যাসের স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতির কারণে বাসাবাড়িতে রান্নার কাজ যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও দীর্ঘ লাইন তৈরি হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শিল্প উৎপাদন। তৈরি পোশাক খাতসহ ডাইং এবং টেক্সটাইল কারখানাগুলোতে উৎপাদন প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্ন রাখতে গ্যাসের পর্যাপ্ত চাপ অপরিহার্য, যা এই সংকটের ফলে মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
বিদ্যমান অবকাঠামো ও সংকট
বাংলাদেশে বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ সক্রিয় রয়েছে। এর একটির সক্ষমতা প্রায় ৫০০ এমএমসিএফডি। সমুদ্রের উত্তাল পরিস্থিতি বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রায়ই এই টার্মিনালগুলো রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন পড়ে। একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্তমানে গ্রিডে সরবরাহের ক্ষেত্রে বিশাল ঘাটতি তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাতীয় গ্রিড যখন আমদানিকৃত এলএনজির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন একটি টার্মিনাল বন্ধ হওয়া মানেই দেশের শিল্পায়ন ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ধাক্কা।
জ্বালানি খাতের বর্তমান চিত্র
বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা প্রায় ৩,৮০০ থেকে ৪,০০০ এমএমসিএফডি। এর বিপরীতে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে ৩,০০০ এমএমসিএফডির কম। চাহিদার এই বিশাল ফারাক মেটাতে সরকারকে নিয়মিত স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করতে হয়। কিন্তু কারিগরি ত্রুটি বা লজিস্টিক সমস্যার কারণে সরবরাহ হঠাৎ কমে গেলে গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিগুলোর পক্ষে সুষম বণ্টন বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে তিতাস গ্যাসের মতো বৃহৎ বিতরণকারী সংস্থাকে সিস্টেমের ভারসাম্য রক্ষা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
কর্তৃপক্ষের অবস্থান
উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানের মিডিয়া ও জনসংযোগ শাখার ব্যবস্থাপক মো. আল আমিন জানিয়েছেন, কারিগরি ত্রুটি সারিয়ে সরবরাহ স্বাভাবিক করার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। তবে ঠিক কত সময়ের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়নি।
পাবলিক ইউটিলিটি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প রিগ্যাসিফিকেশন ব্যবস্থা এবং স্থলভাগে স্থায়ী এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের গুরুত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাময়িক এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে কলকারখানার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। আপাতত টার্মিনালটি পুনরায় চালু না হওয়া পর্যন্ত গ্রাহকদের মিতব্যয়ী হওয়ার এবং ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।


