বাংলাদেশ-ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়: অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত

বাংলাদেশ-ইউরোপীয় ইউনিয়ন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়: অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত

জাতীয় ডেস্ক

বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইউরোপীয় ইউনিয়ন) মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি কৌশলগত ও আইনি কাঠামোয় রূপ দিতে ঐতিহাসিক ‘অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি’ (পিসিএ) এর প্রাথমিক সংস্করণ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছে। সোমবার বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে ইউরোপীয় এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের (ইইএএস) সদর দপ্তরে এই চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ঢাকা-ইউরোপীয় ইউনিয়ন কূটনৈতিক সম্পর্কে এক নতুন মাইলফলক অর্জিত হলো। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশই প্রথম এই ধরনের বিস্তৃত ও আইনিভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।

চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) মো. নজরুল ইসলাম এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের পক্ষে ইইএএস-এর ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর পাওলা পামপোলিনি সই করেন। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ ও ভাইস প্রেসিডেন্ট কায়া কালাস এবং প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।

গত কয়েক দশক ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়ন মূলত বাংলাদেশের উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। ২০০১ সালে স্বাক্ষরিত সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে এই সম্পর্ক বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সীমাবদ্ধ থাকলেও নতুন পিসিএ চুক্তি একে একটি ভবিষ্যৎমুখী রাজনৈতিক ও কৌশলগত রূপরেখা প্রদান করবে। এর মাধ্যমে দুই পক্ষের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ, নিরাপত্তা সহযোগিতা, সুশাসন, মানবাধিকার এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সমন্বিতভাবে কাজ করার সুযোগ তৈরি হবে।

চুক্তি স্বাক্ষর পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের হাই-রিপ্রেজেন্টেটিভ কায়া কালাস অভিন্ন মত ব্যক্ত করে বলেন, এই চুক্তিটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে কেবল একটি আনুষ্ঠানিক দলিল নয়, বরং এটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা খাতে পারস্পরিক আস্থার এক নতুন ভিত্তি। তারা আশা প্রকাশ করেন যে, এর ফলে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে বাংলাদেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে সহযোগিতা আরও নিবিড় হবে। ঢাকার ইউরোপীয় ইউনিয়ন অফিস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পিসিএ-এর মাধ্যমে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছে উভয় পক্ষ, যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও পারস্পরিক সমৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করবে।

পিসিএ চুক্তির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বাংলাদেশের উদীয়মান অর্থনীতির জন্য। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য। বর্তমানে বাংলাদেশ এলডিসি (স্বল্পোন্নত দেশ) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকায় ভবিষ্যতে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা বা জিএসপি প্লাস পাওয়ার ক্ষেত্রে এই চুক্তিটি একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের ২৭টি দেশের এই জোটের সঙ্গে এমন একটি চুক্তি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করবে এবং বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।

উল্লেখ্য, এই চুক্তির পথপরিক্রমা ছিল বেশ দীর্ঘ ও ঘটনাবহুল। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে ব্রাসেলসে এই চুক্তির আনুষ্ঠানিক আলোচনার সিদ্ধান্ত হয়। তবে ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আলোচনার গতি কিছুটা থমকে গেলেও পরবর্তী সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে ইইউ পুনরায় আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করে। গত এক বছরে পাঁচ দফা নিবিড় আলোচনার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিক স্বাক্ষর বা অনুস্বাক্ষরের পর এখন পরবর্তী ধাপ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যভুক্ত ২৭টি দেশে এই চুক্তির প্রস্তাবনা পাঠানো হবে। প্রতিটি সদস্য দেশের সংসদীয় এবং আইনি প্রক্রিয়ায় অনুমোদন লাভের পর চূড়ান্তভাবে এই অংশীদারত্ব ও সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। এই চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মতো অপ্রচলিত খাতগুলোতেও ইউরোপীয় সহযোগিতা বৃদ্ধি পাবে, যা বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় উন্নয়নে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ