আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার তোড়জোড় চললেও রণক্ষেত্রে পরিস্থিতি ক্রমে জটিল হয়ে উঠছে। তেহরান একদিকে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রাখার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের জবাবে যুদ্ধক্ষেত্রে ‘নতুন কার্ড’ প্রদর্শনের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে। মূলত অবরোধ প্রত্যাহার ও জাহাজ জব্দের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান অস্থিরতা এখন এক নতুন শিখরে পৌঁছেছে।
সোমবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার এবং পাকিস্তানে অবস্থানরত ইরানি প্রতিনিধি দলের প্রধান মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ মার্কিন নীতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্রমাগত অবরোধ আরোপ এবং পূর্ববর্তী যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের মাধ্যমে তেহরানের ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে। গালিবাফ স্পষ্ট ভাষায় জানান, কোনো ধরনের হুমকির মুখে ইরান আলোচনায় বসবে না। একই সঙ্গে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, প্রয়োজনে ইরান যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার নতুন কৌশল বা ‘কার্ড’ দেখাতে পুরোপুরি প্রস্তুত।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যেই তেহরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সোমবার জানিয়েছেন, পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি ইরানের বিবেচনায় রয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়ার প্রধান শর্ত হিসেবে ইরানের ওপর আরোপিত বন্দর অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টি সামনে আনা হয়েছে। ইরানের মতে, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ বহাল রেখে অর্থবহ কূটনৈতিক সংলাপ সম্ভব নয়। তবে সংশ্লিষ্ট ওই কর্মকর্তা এটিও নিশ্চিত করেছেন যে, আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়ে ইরান সরকার এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কূটনৈতিক স্থবিরতার জন্য সরাসরি ওয়াশিংটনকে দায়ী করেছেন। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ধারাবাহিক ‘যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন’ শান্তি প্রক্রিয়ার পথে প্রধান অন্তরায়। উল্লেখ্য, দুই সপ্তাহের জন্য ঘোষিত চলতি যুদ্ধবিরতির মেয়াদ আগামী বুধবার শেষ হতে যাচ্ছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই মেয়াদ আর বাড়বে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সংশয় তৈরি হয়েছে।
গত রোববার একটি ইরানি কার্গো জাহাজ মার্কিন বাহিনীর হাতে জব্দ হওয়ার পর উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। ওয়াশিংটনের দাবি, জাহাজটি আন্তর্জাতিক অবরোধ অমান্য করে পণ্য পরিবহনের চেষ্টা করছিল। এই ঘটনার পর তেহরান পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দিয়েছে, যা সম্ভাব্য আলোচনার পরিবেশকে আরও অস্থিতিশীল করে তুলেছে।
বিপরীতে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার অনমনীয় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি জানান, কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে না পৌঁছানো পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করবে না। তবে ট্রাম্প দাবি করেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে যে পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে, তা ২০১৫ সালের ঐতিহাসিক চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি কার্যকর ও শক্তিশালী হবে।
এদিকে, মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ইসলামাবাদ সফর নিয়ে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছিল, তা আপাতত নাকচ হয়ে গেছে। জানা গেছে, সোমবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রেই অবস্থান করছিলেন। ভাইস প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতি দ্বিতীয় দফা আলোচনার অনিশ্চয়তাকে বাড়িয়ে দিলেও ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনার প্রাথমিক প্রস্তুতি অব্যাহত রয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যসহ বৈশ্বিক রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে আলোচনার টেবিল, অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রের প্রস্তুতি—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে আগামী কয়েক দিন পারমাণবিক স্থিতিশীলতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে বুধবার যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর দুই পক্ষ কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ ভূ-রাজনীতি।


