আইএমএফের বাজেট সহায়তায় কঠোর শর্ত: সংস্কারে ব্যর্থ হলে ঋণ স্থগিতের হুঁশিয়ারি

আইএমএফের বাজেট সহায়তায় কঠোর শর্ত: সংস্কারে ব্যর্থ হলে ঋণ স্থগিতের হুঁশিয়ারি

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সংস্কার কর্মসূচিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) তাদের অবস্থানে আরও কঠোর হয়েছে। সংস্থাটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, পূর্বনির্ধারিত সংস্কারগুলো সফলভাবে সম্পন্ন করতে না পারলে স্থগিত হওয়া ঋণের কিস্তি ছাড়ের বিষয়ে নতুন কোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। বিশেষ করে রাজস্ব কাঠামো, ব্যাংকিং খাতের সুশাসন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে সরকারের ধীরগতিতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বৈশ্বিক এই ঋণদাতা সংস্থাটি।

সম্প্রতি ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভার সাইডলাইনে বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলের সঙ্গে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অর্থ বিভাগ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, এসব বৈঠকে আইএমএফের পক্ষ থেকে আর্থিক খাতের বিদ্যমান দুর্বলতাগুলো নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন জোরদার না করা এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে আইনি ও প্রশাসনিক শিথিলতাকে সংস্থাটি নেতিবাচকভাবে দেখছে। সংস্থাটির মতে, ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের উচ্চহার এবং বারবার ঋণ পুনঃতফসিল করার সুযোগ দেওয়ার ফলে আর্থিক স্থিতিশীলতা চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে।

রাজস্ব খাতের সংস্কার নিয়ে আইএমএফের পর্যবেক্ষণ অত্যন্তু নিবিড়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) পুনর্গঠন বা সংস্কার প্রক্রিয়ায় স্থবিরতা আসায় দেশের কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়ছে না। বর্তমানে এই অনুপাত ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, যা দক্ষিণ এশিয়াসহ সমপর্যায়ের দেশগুলোর তুলনায় বেশ নিচে। কর নেট সম্প্রসারণ, ভ্যাট ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং আয়কর আদায় বাড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ধরনের দূরত্ব রয়েছে বলে মনে করছে আইএমএফ।

এদিকে, দেশের অর্থনীতিতে বিদ্যমান চাপের মুখে আইএমএফ দেড় বিলিয়ন ডলারের নতুন একটি বাজেট সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও তার পেছনে জুড়ে দিয়েছে কঠোর শর্ত। সংস্থাটি স্পষ্টভাবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, সংস্কার কর্মসূচি পরিপালনে বিচ্যুতি ঘটলে এই সহায়তা যেকোনো সময় স্থগিত করা হতে পারে। বিশেষ করে বাজেট থেকে ক্রমান্বয়ে ভর্তুকি কমিয়ে আনা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। যদিও প্রতি বছরই বাজেটে ভর্তুকির আকার বাড়ছে, যা আইএমএফের মূল নীতিমালার পরিপন্থী।

আইএমএফের সঙ্গে চলমান ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির কিস্তি নিয়ে আলোচনার মধ্যেই সম্প্রতি জ্বালানি তেল ও গ্যাসের দাম রেকর্ড পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, আইএমএফের চাপে নয় বরং বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতির কারণে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে পরিবহন খাতসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যমূল্যের ওপর পড়তে শুরু করেছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিষয়টিও বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

বৈঠকে আইএমএফের প্রতিনিধিরা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর মুদ্রানীতি অব্যাহত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা মনে করেন, নীতি সুদহার বৃদ্ধির মাধ্যমে বাজারে অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ না করলে মূল্যস্ফীতি লাগামহীন হয়ে পড়তে পারে। এছাড়া বাজারভিত্তিক বিনিময় হার পুরোপুরি কার্যকর করার তাগিদ দিয়ে বলা হয়েছে, কৃত্রিমভাবে বৈদেশিক মুদ্রার হার ধরে রাখলে রিজার্ভের ওপর চাপ আরও বাড়বে। আগামী বাজেটে এসব সংস্কারের পূর্ণ প্রতিফলন দেখতে চায় সংস্থাটি।

সার্বিক বিষয়ে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, আইএমএফের বাজেট সহায়তা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা স্বস্তি দিলেও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া দীর্ঘমেয়াদী সুফল পাওয়া কঠিন। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, এই সহায়তা বাজেট ঘাটতি ব্যবস্থাপনায় সহায়ক হবে। তবে শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হলে ঋণ সহায়তার পথ বন্ধ হয়ে যেতে পারে। ফলে সরকারকে রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরিচয় দিয়ে ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে দৃশ্যমান সংস্কার নিশ্চিত করতে হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সংস্কার কার্যক্রমের গতিপ্রকৃতি এবং আইএমএফের কঠোর অবস্থানের কারণে সরকারের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। বাজেট সহায়তা প্রাপ্তি এবং ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তিগুলো নিশ্চিত করতে হলে আগামী কয়েক মাসে সরকারকে আর্থিক খাতের মৌলিক সংস্কারগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখাতে হবে। অন্যথায় সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ