আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটিতে গত বছর সংঘটিত একটি প্রাণঘাতী গুলিবর্ষণের ঘটনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ‘চ্যাটজিপিটি’ এবং এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ওপেনএআই’-এর বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে ফ্লোরিডা রাজ্য সরকার। অভিযোগ উঠেছে, ওই হামলার প্রস্তুতি পর্বে অভিযুক্ত বন্দুকধারীকে অস্ত্র নির্বাচন এবং এর কার্যকারিতা সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কারিগরি পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করেছে এই এআই চ্যাটবট। প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধে সহায়তার এই অভিযোগ বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ও আইনি দায়বদ্ধতাকে নতুন করে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।
গত বছরের এপ্রিলে ফ্লোরিডা স্টেট ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গণে এক বন্দুকধারীর অতর্কিত হামলায় দুইজন নিহত এবং ছয়জন আহত হন। ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর গুলিতে আহত অবস্থায় ধরা পড়েন অভিযুক্ত ব্যক্তি। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা চলমান রয়েছে। মামলার তদন্ত চলাকালীন অভিযুক্তের ডিজিটাল ডিভাইসে চ্যাটজিপিটির সাথে কথোপকথনের এমন কিছু তথ্য উঠে আসে, যা প্রসিকিউটরদের এই নতুন তদন্তে উৎসাহিত করেছে।
ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমায়ার এক বিবৃতিতে জানান, চ্যাটবটটি শুটারকে কোনো ধরনের বন্দুক ব্যবহার করা উচিত, নির্দিষ্ট অস্ত্রের সাথে কোন ধরনের গোলাবারুদ সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং স্বল্প দূরত্বে সেই অস্ত্রের মারণক্ষমতা কতটুকু হতে পারে—এমন সংবেদনশীল বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দিয়েছে। উথমায়ারের মতে, “স্ক্রিনের ওপাশে যদি কোনো রক্ত-মাংসের মানুষ এভাবে অপরাধে দিকনির্দেশনা দিত, তবে তার বিরুদ্ধে সরাসরি খুনের প্ররোচনা বা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হতো। প্রযুক্তির আড়ালে এই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।”
ফ্লোরিডার প্রসিকিউশন দপ্তর ইতিমধ্যে ওপেনএআই-কে সকল প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ তলব করেছে। এই তদন্তের মূল লক্ষ্য হলো, চ্যাটজিপিটির দেওয়া তথ্য ওই অপরাধ সংঘটনে ঠিক কতটা প্রভাব ফেলেছে এবং একটি বাণিজ্যিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে তাদের অ্যালগরিদমের অপব্যবহারের জন্য ফৌজদারিভাবে দায়ী করা যায় কি না তা খতিয়ে দেখা। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এআই নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধমূলক প্ররোচনার অভিযোগে অন্যতম বড় আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ওপেনএআই কর্তৃপক্ষ এই ঘটনাকে ‘মর্মান্তিক’ হিসেবে বর্ণনা করলেও সরাসরি কোনো দায় নিতে অস্বীকার করেছে। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা ইতিমধ্যে অভিযুক্তের চ্যাটজিপিটি অ্যাকাউন্ট শনাক্ত করেছে এবং আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে তদন্তে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করছে। তাদের দাবি, চ্যাটবটটি কেবল ইন্টারনেটে বিদ্যমান উন্মুক্ত ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য সরবরাহ করেছে এবং কোনো পর্যায়েই অবৈধ কাজ করতে ব্যবহারকারীকে উৎসাহিত করেনি। তাদের নীতিমালায় সহিংসতাকে নিরুৎসাহিত করার সুরক্ষাকবচ থাকলেও, তথ্যগত প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই তদন্তের ফলাফল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। বর্তমান সময়ে এআই-এর মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানো বা কপিরাইট লঙ্ঘনের মতো বিষয়গুলো আলোচিত হলেও, সরাসরি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে এর সম্পৃক্ততা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। যদি ওপেনএআই দোষী সাব্যস্ত হয়, তবে বিশ্বব্যাপী এআই কোম্পানিগুলোকে তাদের সেফটি প্রোটোকল বা নিরাপত্তামূলক ফিল্টারগুলো আরও কঠোর করতে বাধ্য হতে হবে।
এই ঘটনাটি প্রযুক্তি খাতে এক কঠিন প্রশ্ন উত্থাপন করেছে: যখন কোনো মেশিন বা অ্যালগরিদম ক্ষতিকারক তথ্য প্রদান করে, তখন তার দায় কার? ব্যবহারকারীর, নাকি সেই কোডটি যারা লিখেছেন তাদের? ফ্লোরিডার এই তদন্ত কেবল একটি নির্দিষ্ট হামলার বিচার নয়, বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত প্রসারের যুগে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক নতুন লড়াই হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তির অবাধ বিচরণ—এই দুইয়ের ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ।


