আন্তর্জাতিক ডেস্ক
হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ ও নৌযান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের নেতৃত্বে একটি আন্তর্জাতিক সামরিক মিশন গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই সমুদ্রসীমায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বুধবার থেকে লন্ডনে দুই দিনব্যাপী একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়েছে। ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমন্ত্রণে এই বৈঠকে ৩০টিরও বেশি দেশের সামরিক বিশেষজ্ঞ ও প্রতিনিধিরা অংশ নিচ্ছেন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহে প্যারিসে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক আলোচনার ধারাবাহিকতায় এই সম্মেলনটি আয়োজন করা হয়েছে। সম্মেলনের মূল লক্ষ্য হলো একটি সমন্বিত সামরিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা, যার মাধ্যমে প্রণালিতে নির্বিঘ্নে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। উত্তর-পশ্চিম লন্ডনে অবস্থিত যুক্তরাজ্যের প্রধান সামরিক কমান্ড সেন্টার ‘পার্মানেন্ট জয়েন্ট হেডকোয়ার্টার্স’ (PJHQ) থেকে এই কার্যক্রম তদারকি ও পরিচালনা করা হচ্ছে।
ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলি এই উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “আমাদের প্রধান লক্ষ্য হলো বিভিন্ন বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রগুলোর মতামত ও সক্ষমতাকে একীভূত করে একটি শক্তিশালী যৌথ পরিকল্পনা তৈরি করা। আমরা চাই হরমুজ প্রণালিতে নৌযান চলাচলের স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং ওই অঞ্চলে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে।” আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে তিনি ইতিবাচক আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
এর আগে গত শুক্রবার প্যারিসে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার এবং ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁর যৌথ সভাপতিত্বে একটি আন্তর্জাতিক কৌশলগত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় প্রায় ৪০টি দেশ অংশগ্রহণ করেছিল। যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, প্রস্তাবিত এই আন্তর্জাতিক বাহিনীটি হবে সম্পূর্ণ রক্ষণাত্মক বা প্রতিরক্ষা কার্যক্রমনির্ভর। এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হওয়ার সাপেক্ষেই কেবল এই বাহিনী মোতায়েন করা হবে।
আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এই বিশেষ মিশন সংক্রান্ত আলোচনায় সরাসরি অংশ নেয়নি। সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে দেশ দুটি বর্তমানে যুদ্ধরত পক্ষ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় তাদের এই প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে। মঙ্গলবার মধ্যরাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলোচনার স্বার্থে এই মেয়াদ বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তবে যুদ্ধবিরতি চললেও উভয় পক্ষ একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রশাসন ইরানের বন্দরগুলোর ওপর তাদের আরোপিত কঠোর অবরোধ বজায় রাখার সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ। বৈশ্বিক তেলের বাজারের একটি বড় অংশ এই জলপথের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক উত্তেজনার ফলে এই পথে জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। লন্ডনে অনুষ্ঠিত এই সামরিক বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের সম্মেলন থেকে প্রাপ্ত সুপারিশের ভিত্তিতেই প্রণালিটি পুনরায় পূর্ণাঙ্গভাবে খুলে দেওয়ার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। এই উদ্যোগটি সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তায় একটি নতুন বহুজাতিক সহযোগিতার অধ্যায় শুরু হবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।


