আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী এশিয়ার বিভিন্ন দেশের জলসীমা থেকে ইরানের অন্তত তিনটি তেলবাহী বিশাল ট্যাংকার জব্দ করেছে। ভারত, মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছ থেকে এসব জাহাজ জব্দ করা হয়। ওয়াশিংটন কর্তৃক তেহরানের সমুদ্রপথের বাণিজ্যের ওপর কঠোর অবরোধ আরোপের পর এই পদক্ষেপ নেওয়া হলো। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ঘটনার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত ও উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেতে পারে।
শিপিং ও নিরাপত্তা সূত্রের তথ্যানুযায়ী, জব্দকৃত ট্যাংকারগুলোর মধ্যে ‘ডিপ সি’ নামক একটি সুপারট্যাংকার রয়েছে, যা এক সপ্তাহ আগে মালয়েশিয়া উপকূল থেকে নিখোঁজ হয়েছিল। এছাড়া ‘সেভিন’ ও ‘ডোরেনা’ নামক আরও দুটি জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ডোরেনা নামক ট্যাংকারটি প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিয়ে ভারত উপকূলের কাছাকাছি অবস্থানে ছিল। বর্তমানে জাহাজটি মার্কিন রণতরীর পাহারায় ভারত মহাসাগরে অবস্থান করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানি বন্দরসমূহের ওপর আরোপিত অবরোধ অমান্য করার প্রচেষ্টায় এসব জাহাজ আটক করা হয়েছে। সেন্টকমের দাবি অনুযায়ী, অবরোধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত তারা অন্তত ২৯টি জাহাজকে ইরানি বন্দরে ফিরে যেতে বাধ্য করেছে। সমুদ্রপথে ইরানের সামরিক তৎপরতা এবং ভাসমান মাইনের ঝুঁকি এড়াতে মার্কিন বাহিনী এখন উন্মুক্ত সাগরে ইরানি জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করছে।
সাম্প্রতিক এই সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে। মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার দিয়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়। তেহরান এই রুটটি বন্ধ করার লক্ষ্যে এর আগে তিনটি জাহাজে গুলিবর্ষণ করেছিল, যার ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে গত কয়েক দিনে মার্কিন বাহিনী ইরানের একটি কার্গো জাহাজ ও একটি তেলবাহী ট্যাংকার জব্দ করে।
এদিকে ইরানের পক্ষ থেকেও পাল্টা পদক্ষেপ গ্রহণের খবর পাওয়া গেছে। তেহরান জানিয়েছে, বুধবার হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করার সময় তারা দুটি কন্টেইনার জাহাজ জব্দ করেছে। দুই মাস আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটিই তেহরানের পক্ষ থেকে প্রথম জাহাজ জব্দের ঘটনা।
বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনো ধরনের শান্তি আলোচনার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বরং দুই পক্ষই একে অপরের বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজ লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করায় সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীর মতো স্পর্শকাতর বাণিজ্যিক রুটটি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এশিয়ায় এই জাহাজ জব্দের ঘটনা কেবল বাণিজ্যিক অবরোধের অংশ নয়, বরং এটি ইরানের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড দুর্বল করার একটি বৃহত্তর কৌশল। তবে এই পাল্টা-পাল্টি পদক্ষেপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও দীর্ঘস্থায়ী এবং জটিল রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ওমান সাগর ও ভারত মহাসাগরের এই অস্থিরতা নিরসনে আন্তর্জাতিক মহলের কার্যকর হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।


