অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে আটকে থাকা তেলবাহী ট্যাংকারগুলো পুনরায় চলাচল শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে—এমন খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের পতন লক্ষ্য করা গেছে। বৈশ্বিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য হ্রাস পেয়ে গত চার মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ের কাছাকাছি অবস্থানে নেমে এসেছে। দীর্ঘদিনের সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কেটে যাওয়ার লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ায় বাজার পরিস্থিতি ক্রেতাদের অনুকূলে চলে এসেছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৭ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ কমে ৭৬ দশমিক ৭১ মার্কিন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৩৬ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৭২ দশমিক ৮৫ মার্কিন ডলারে নেমে এসেছে। মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর জন্য এই ধারাবাহিক দরপতনকে একটি বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্বালানি খাতের বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক তেলবাহী জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার স্পষ্ট সংকেত মেলায় বিশ্ববাজারে দীর্ঘদিনের কৃত্রিম সরবরাহ সংকটের অবসান ঘটতে যাচ্ছে। বিশেষ করে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা এখন অনেকটাই প্রশমিত। বৈশ্বিক সমুদ্রসীমার অন্যতম প্রধান এই রুটটি পুনরায় সচল হওয়ায় অপরিশোধিত তেলের বাজারে অতিরিক্ত মূল্য চাপ কমতে শুরু করেছে।
জাপানের শীর্ষস্থানীয় আর্থিক প্রতিষ্ঠান মিৎসুবিশি ইউএফজে রিসার্চ অ্যান্ড কনসাল্টিংয়ের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ তোমোমিচি আকুতা বৈশ্বিক বাজারের এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে জানান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা হ্রাস পাওয়ার জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সাথে হরমুজ প্রণালির অবরুদ্ধ নৌপথ দিয়ে পুনরায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল সরবরাহ শুরু হওয়ার প্রক্রিয়াটি বাজার গতিশীল করতে সরাসরি ভূমিকা রাখছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে পারমাণবিক চুক্তি পুনরুজ্জীবিতকরণ সংক্রান্ত বহুপাক্ষিক আলোচনা যদি ইতিবাচকভাবে এগিয়ে যায়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।
আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমার জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে কয়েক সপ্তাহ ধরে অবরুদ্ধ থাকা তিনটি অত্যন্ত বৃহৎ আকৃতির তেলবাহী ট্যাংকার (ভিএলসিসি) মঙ্গলবার কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই সফলভাবে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। মূলত এই ঘটনাটিই বিশ্ববাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দৈনিক মূল্য তালিকায়।
এদিকে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন সংস্থা (আইএমও) থেকে প্রাপ্ত সর্বশেষ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কার্যকর হওয়া সাময়িক যুদ্ধবিরতি চুক্তির সফল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সেখানে আটকা পড়া বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে ওই অঞ্চলে প্রায় ১১ হাজার আন্তর্জাতিক নাবিকসহ শত শত মালবাহী জাহাজ আটকা পড়েছিল। বর্তমানে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের নৌবাহিনীর সার্বিক সমন্বয় ও নিরাপত্তা নজরদারির মাধ্যমে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট ও সীমিত সংখ্যক জাহাজকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেওয়া হচ্ছে।
জ্বালানি বাজারের প্রধান বিশ্লেষকদের সাধারণ পূর্বাভাস অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও তেল সরবরাহের এই ইতিবাচক ধারা যদি আগামী দিনগুলোতেও বজায় থাকে, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আরও নিম্নমুখী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সরবরাহ চেইন পুরোপুরি সচল হলে এবং বাজারে তেলের প্রাপ্যতা বাড়লে বৈশ্বিক শিল্পোৎপাদন এবং পরিবহন খাতে এর সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।


