রাজনীতি ডেস্ক
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীতে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসার মায়ের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় তাকে রাজধানীর একটি বিশেষায়িত মাল্টিডিসিপ্লিনারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একমাত্র সন্তানকে হারানোর গভীর মানসিক আঘাত (ট্রমা) এবং পূর্ববর্তী বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা নিয়ে গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) সকালে তিনি হাসপাতালে ভর্তি হন। তার চিকিৎসায় বিভিন্ন বিভাগের বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি মেডিকেল বোর্ড গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পারিবারিক ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, সন্তানকে হারানোর পর থেকেই রামিসার মা তীব্র মানসিক শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছেন। এই মনস্তাত্ত্বিক আঘাতের পাশাপাশি তার দীর্ঘদিনের কিছু শারীরিক অসুস্থতা, যেমন—বুকে ব্যথা, ভার্টিগো বা মাথা ঘোরানো, স্নায়বিক দুর্বলতা এবং পরিপাকতন্ত্রের সমস্যাগুলো নতুন করে প্রকট আকার ধারণ করেছে। মানসিক ও শারীরিক এই দ্বিমুখী সংকটের কারণে তার বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রামিসার বাবা বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলামের শরণাপন্ন হলে তিনি বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেন। তার তাৎক্ষণিক উদ্যোগে মঙ্গলবার সকালেই রোগীকে বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা হয়। সেখানে ভর্তির পর থেকেই চিকিৎসকদের একটি দল তার প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও তত্ত্বাবধান শুরু করেছে।
অধ্যাপক ডা. মো. রফিকুল ইসলাম গণমাধ্যমকে জানান, সন্তান হারানোর মতো মর্মান্তিক ও আকস্মিক ঘটনা যেকোনো মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে। রামিসার মায়ের ক্ষেত্রেও এই গভীর শোক ও মানসিক ট্রমা তার পুরনো শারীরিক রোগগুলোকে আরও জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইতোমধ্যে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ এবং পেশাদার সাইকোলজিস্টদের সমন্বয়ে তার নিয়মিত কাউন্সেলিং সেশন শুরু করা হয়েছে। একই সাথে শারীরিক অন্যান্য জটিলতার ধরন ও তীব্রতা নির্ণয়ের প্রক্রিয়া চলছে।
চিকিৎসা পদ্ধতি সুচারুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে একটি সমন্বিত উচ্চপর্যায়ের মেডিকেল বোর্ড গঠনের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই বোর্ডে মানসিক রোগ, হৃদরোগ (কার্ডিওলজি), নিউরোলজি এবং গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি (পারিপাকতন্ত্র) বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই বোর্ড সম্মিলিতভাবে রোগীর সব ধরনের স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট পর্যালোচনা করবে এবং সেই অনুযায়ী একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা পরিকল্পনা (ট্রিটমেন্ট প্ল্যান) প্রণয়ন করবে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বর্তমানে রোগীর সার্বিক শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রয়েছে এবং তিনি চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে আছেন। তবে সব ধরনের প্রয়োজনীয় ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন হওয়ার পর চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ ও ওষুধের মাত্রা নির্ধারণ করা হবে।
চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, তীব্র মানসিক আঘাত মানুষের শরীরের স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্র এবং হৃদযন্ত্রের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে, যা পূর্বের মৃদু শারীরিক সমস্যাকে তীব্রতর করতে পারে। এই ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে ওষুধের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সাইকোসোশ্যাল সাপোর্ট বা মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার প্রয়োজন হয়।
নিহত শিশু রামিসার স্বজনরা আশা প্রকাশ করেছেন যে, দ্রুততম সময়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে এই বহুবিভাগীয় (মাল্টিডিসিপ্লিনারি) চিকিৎসা সেবা প্রদানের ফলে তিনি দ্রুত এই সংকট কাটিয়ে উঠবেন এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ জীবনে ফিরে আসতে সক্ষম হবেন।


