অর্থনীতি প্রতিবেদক
কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার অর্থনীতি বিষয়ক লেকচারার এবং উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, বাংলাদেশে জ্বালানি খাতে নীতি দুর্বলতা ও দুর্নীতির কারণে বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। তিনি বলেন, সামিট গ্রুপের বিরুদ্ধে প্রায় ১১০০ কোটি টাকার কর ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে এবং কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ খাতকে কেন্দ্র করে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়ম ঘটেছে বলে তিনি মনে করেন।
সম্প্রতি এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি আয়োজিত ‘জ্বালানি, অর্থনীতি, মানবাধিকার, সংস্কার ও গণভোট’ শীর্ষক জাতীয় কনভেনশনে তিনি এসব মন্তব্য করেন। সেখানে তিনি দেশের জ্বালানি খাতের কাঠামোগত সমস্যা, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা, আমদানি ব্যয় এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা করেন।
ড. খান জহিরুল ইসলাম বলেন, ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের সময়কালে জ্বালানি খাতে আর্থিক ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে শত শত কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ—প্রায় ২১ শতাংশ—নির্দিষ্ট একটি বেসরকারি গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা জ্বালানি বাজারের কাঠামো ও প্রতিযোগিতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি দাবি করেন, কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রীয় অর্থের বড় ধরনের অপচয় হয়েছে। তার মতে, এই ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বাস্তব উৎপাদন এবং ব্যবহারের মধ্যে পার্থক্য থেকে যায়, যা অর্থনৈতিক দক্ষতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করে।
জ্বালানি সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ঘাটতি মূলত সম্পদের অভাবের কারণে নয়, বরং নীতি ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এ ক্ষেত্রে দুটি প্রধান কারণ উল্লেখ করেন—একটি হলো দুর্নীতি এবং অন্যটি হলো নীতিগত ভুল সিদ্ধান্ত। তার মতে, এই দুই কারণে জ্বালানি খাত কাঙ্ক্ষিত কার্যকারিতা অর্জন করতে পারছে না।
তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ প্রতিবছর জ্বালানি আমদানিতে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করে, যা দেশের মোট বাজেটের প্রায় ১৯ শতাংশের সমান। এই উচ্চ ব্যয় অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ও চাহিদার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতার তুলনায় প্রকৃত চাহিদা তুলনামূলকভাবে কম হলেও অনেক ক্ষেত্রে লোডশেডিং দেখা যায়। তার মতে, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও বাস্তব উৎপাদন পর্যায়ে সীমাবদ্ধতা এবং ব্যবস্থাপনাগত সমস্যার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তিনি এটিকে সম্পদের অপচয় ও অনিয়মের সম্ভাব্য উৎস হিসেবে উল্লেখ করেন।
জ্বালানি খাতের বিকল্প সমাধান হিসেবে তিনি বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার মধ্যে শুধু ঢাকা শহরেই ৬ থেকে ৭ হাজার টন বর্জ্য তৈরি হয়। এই বর্জ্য যথাযথ প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুতে রূপান্তর করা গেলে প্রতিদিন প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হতে পারে বলে তিনি মত দেন। এটি লোডশেডিং কমাতে সহায়ক হতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আলোচনায় জ্বালানি খাতের সংস্কার, স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং নীতিগত পুনর্বিবেচনার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং নীতি কাঠামোর সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন।


