অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তিকে পারস্পরিক স্বার্থে যথাযথভাবে ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। আন্তর্জাতিক চুক্তির ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের সমান সুযোগ বা ‘উইন-উইন’ পরিস্থিতির ওপর জোর দিয়ে তিনি জানিয়েছেন, চুক্তির প্রায়োগিক দিক নিয়ে জনমনে উদ্বেগের কোনো কারণ নেই।
মঙ্গলবার (৫ মে, ২০২৬) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক সহকারী বাণিজ্য প্রতিনিধি ব্রেন্ডন লিঞ্চের সঙ্গে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) মো. আবদুর রহিম খানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বর্তমান সরকার এই চুক্তির প্রাথমিক সূচনাকারী না হলেও রাষ্ট্রীয় নীতিগত ধারাবাহিকতার কারণে এটি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পাদিত কোনো চুক্তি ব্যক্তিগত চুক্তির মতো নয় যে ইচ্ছামতো বাতিল করা যাবে। এটি একটি বাস্তবতা এবং আমাদের লক্ষ্য হলো দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে এই চুক্তির সুযোগগুলোকে সর্বোচ্চ কাজে লাগানো।”
বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সম্প্রতি শুরু হওয়া একটি তদন্ত প্রক্রিয়ার (ইনভেস্টিগেশন) বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছিল এবং প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ইতোমধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ও পর্যবেক্ষণ ওয়াশিংটনকে জানানো হয়েছে। মন্ত্রী মন্তব্য করেন যে, বিদ্যমান চুক্তির প্রেক্ষাপটে এই ধরনের তদন্ত শুরু না হলে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য আরও ইতিবাচক হতো।
বৈশ্বিক বাজারে পণ্য সরবরাহ ও ডাম্পিং সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ব্যাখ্যা করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের কোনো উৎপাদন খাতেই ‘ওভার ক্যাপাসিটি’ বা অতিরিক্ত সক্ষমতা নেই। ফলে ডাম্পিং করার মতো অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বাংলাদেশ মূলত একটি আমদানিনির্ভর দেশ। রপ্তানি খাতের প্রধান উৎস তৈরি পোশাক শিল্প কঠোর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও কমপ্লায়েন্স মেনে পরিচালিত হয়। সেখানে শ্রম আইন লঙ্ঘন বা শিশুশ্রমের কোনো অবকাশ নেই বলে তিনি দাবি করেন।
চুক্তি সংশোধন বা বাতিলের সম্ভাবনা সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে বর্তমান সরকার সর্বদা জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। চুক্তির কোনো ধারা যদি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বা বাণিজ্যিক স্বার্থের পরিপন্থী প্রমাণিত হয়, তবে তা সংশোধনের আইনি সুযোগ খোদ চুক্তিতেই বিদ্যমান। একে ‘সেলফ কারেক্টিং এলিমেন্ট’ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, চুক্তির মধ্যেই সমন্বয়ের প্রয়োজনীয় বিধান রয়েছে, যা যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ব্যবহার করা সম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক জোরদার করা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে এলডিসি গ্রাজুয়েশন পরবর্তী সময়ে জিএসপি সুবিধা বা বিকল্প অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে এই ধরনের সংলাপ ও চুক্তি বড় ভূমিকা পালন করে। সরকার এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার আরও সুগম করতে চায়।
বৈঠকে উভয় পক্ষই দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাধা দূরীকরণ এবং বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নয়নে একত্রে কাজ করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। বাণিজ্যমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন যে, সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব এবং অর্থনৈতিক স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখেই আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর।


