প্রশাসনে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে বাড়ছে ই-ফাইলিং ও স্মার্ট অফিসের ব্যবহার

প্রশাসনে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে বাড়ছে ই-ফাইলিং ও স্মার্ট অফিসের ব্যবহার

জাতীয় ডেস্ক

সরকারি দপ্তরে সনাতন কাগজনির্ভর পদ্ধতির পরিবর্তে ডিজিটাল প্রযুক্তি তথা ই-ফাইলিং ও স্মার্ট অফিস ব্যবস্থাপনার ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আসার পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত হচ্ছে। ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ রূপকল্প বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকারি সেবা প্রদান প্রক্রিয়াকে সহজ ও সাশ্রয়ী করতে এই আধুনিকায়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হয়েছে।

জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও আইসিটি বিভাগের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের প্রায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ই-নথি বা ই-ফাইলিং ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। এর ফলে সরকারি কর্মকর্তারা দপ্তরে উপস্থিত না থেকেও যেকোনো স্থান থেকে অনলাইন বা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ফাইল নিষ্পত্তি, অনুমোদন এবং দাপ্তরিক যোগাযোগ সম্পন্ন করতে পারছেন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সচিবালয়ে অধিকাংশ ফাইলের কাজ ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হচ্ছে, যা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সময়কে কয়েক সপ্তাহ থেকে কমিয়ে কয়েক ঘণ্টায় নিয়ে এসেছে।

প্রশাসনিক এই পরিবর্তনের ফলে দুর্নীতির সুযোগও সংকুচিত হয়েছে। আগে ফাইলে নোটশিট পরিবর্তনের যে ঝুঁকি থাকত, ডিজিটাল সিস্টেমে তা প্রায় অসম্ভব। প্রতিটি নথির গতিবিধি ও পরিবর্তনের ইতিহাস স্বয়ংক্রিয়াভাবে সংরক্ষিত থাকায় জালিয়াতির সুযোগ বন্ধ হয়েছে। এছাড়া, সিস্টেমের মাধ্যমে যেকোনো সময় নথির বর্তমান অবস্থান পর্যবেক্ষণ বা ট্র্যাকিং করা যাচ্ছে, যা স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে।

ব্যয় সাশ্রয় ও পরিবেশ সুরক্ষার ক্ষেত্রেও ই-ফাইলিং ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রতিদিন হাজার হাজার নথি ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিষ্পত্তি হওয়ায় কাগজ, প্রিন্টিং সামগ্রী এবং পরিবহন বাবদ বড় অংকের সরকারি অর্থ সাশ্রয় হচ্ছে। কাগজের ব্যবহার হ্রাস পাওয়ায় এটি পরিবেশবান্ধব বা গ্রিন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখছে।

নাগরিক সেবার মানোন্নয়নে এই প্রযুক্তি বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। বিশেষ করে ভূমি সেবা, নামজারি, বিভিন্ন সনদ প্রদান এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মতো মৌলিক সেবাগুলো এখন অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। এর ফলে নাগরিকদের আর দপ্তরে দপ্তরে ঘুরে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে না। রাজশাহীর সেবাপ্রার্থী শারমিন আক্তারসহ একাধিক সেবাগ্রহীতা জানান, ডিজিটাল ব্যবস্থার কারণে কাজের গতি বেড়েছে এবং ফাইল কোথায় আটকে আছে তা সহজেই জানা যাচ্ছে। এর ফলে দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যও কমেছে।

মাঠ পর্যায়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসনগুলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং উন্নয়ন প্রকল্পের তদারকিতে এই প্রযুক্তির সফল ব্যবহার করছে। সরকারি কর্মকর্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে নিয়মিত ই-নথি ব্যবস্থাপনা ও সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ব্যবস্থার পূর্ণ সুফল নিশ্চিতে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা অবকাঠামো, নিরবচ্ছিন্ন উচ্চগতির ইন্টারনেট এবং সব দপ্তরের মধ্যে সমন্বিত ডেটাবেজ গড়ে তোলা জরুরি।

ভবিষ্যতে সরকারি দপ্তরগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও উন্নত তথ্য বিশ্লেষণ প্রযুক্তি যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে সেবা প্রদানের সময় আরও কমিয়ে এনে প্রশাসনকে পূর্ণাঙ্গ নাগরিকবান্ধব ও আধুনিক হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নীতি-নির্ধারকরা।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ