অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
রাজস্ব আহরণ ব্যবস্থায় মৌলিক এবং কাঠামোগত সংস্কার সাধন ছাড়া দেশের বর্তমান ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি জানিয়েছেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি পরিচালনার সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে সংকুচিত করছে।
সোমবার রাতে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে আয়োজিত ‘সোনার বাংলা’ শীর্ষক এক নীতি-নির্ধারণী আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে তিনি দেশের বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অকার্যকর কাঠামো ভেঙে নতুন করে গড়ার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
রাজস্ব সংকটের বর্তমান চিত্র অর্থমন্ত্রী জানান, যেকোনো অর্থনীতির প্রাণশক্তি হলো অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বা ‘রিসোর্স মোবিলাইজেশন’। তবে বাংলাদেশে এই চিত্রটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, “একসময় দেশে কর-জিডিপি অনুপাত ১০ থেকে ১১ শতাংশ থাকলেও বর্তমানে তা কমে ৭ শতাংশের নিচে, অর্থাৎ ৬ দশমিক ৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি কেবল দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন নয়, বরং সারা বিশ্বেই সর্বনিম্ন হারের একটি।”
এই নিম্নমুখী হারের কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে অর্থের টান পড়ছে, যার ফলে নাগরিকদের মৌলিক সেবা প্রদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থমন্ত্রী সতর্ক করে বলেন, ‘ফিসক্যাল স্পেস’ বা আর্থিক সক্ষমতা না থাকলে প্রবৃদ্ধির গতি আরও শ্লথ হয়ে পড়বে।
অসম্পূর্ণ সংস্কারের সমালোচনা ও নতুন পরিকল্পনা এনবিআর সংস্কার নিয়ে পূর্ববর্তী প্রশাসনের নেওয়া পদক্ষেপের সমালোচনা করে আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এর আগে নীতি প্রণয়ন (পলিসি) এবং বাস্তবায়ন (এক্সিকিউশন) আলাদা করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা ছিল ত্রুটিপূর্ণ ও অসম্পূর্ণ। তার মতে, “অসম্পূর্ণ বা ‘হাফ-বেকড’ সংস্কার কোনো সংস্কার না থাকার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। এটি প্রশাসনিক জটিলতা ও বিভ্রান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।”
বর্তমান সরকার সেই অসম্পূর্ণ কাঠামোটি বাতিল বা সংশোধন করে নতুনভাবে সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে বলে তিনি সভায় নিশ্চিত করেন। এ লক্ষ্যে সংসদে উত্থাপিত সংশ্লিষ্ট বিলটি বর্তমানে স্থগিত রাখা হয়েছে এবং একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো—খুব দ্রুত এনবিআরকে নীতি ও বাস্তবায়ন—এই দুই ভাগে কার্যকরভাবে বিভক্ত করা।
ব্যবসায়ীবান্ধব ও জনমুখী করনীতি করনীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিহারের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, যারা করনীতি নির্ধারণ করবেন, তাদের বাংলাদেশের অর্থনীতির ‘ডিএনএ’ বা মৌলিক চরিত্র বুঝতে হবে। শুধু শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে হিসাব মেলানোর জন্য করের বোঝা চাপালে হবে না; বরং শিল্প ও ব্যবসার প্রকৃত সমস্যা এবং সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
মন্ত্রী আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে একই করদাতার ওপর বারবার করের হার বাড়িয়ে লক্ষ্যমাত্রা পূরণের একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। এটি বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে বড় বাধা। তিনি বলেন, “যারা মূলধন সঞ্চয় করছেন এবং নতুন বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান তৈরি করছেন, তাদের ওপর অতিরিক্ত করের চাপ সৃষ্টি করলে পুনঃবিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। আমরা এই জায়গায় বড় পরিবর্তন আনতে চাই।”


