আন্তর্জাতিক ডেস্ক
নেপাল রুট হয়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয়ের এক নতুন বিশ্বরেকর্ড তৈরি হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়ার সুবাদে গত বুধবার একদিনেই রেকর্ডসংখ্যক ২৭৪ জন পর্বতারোহী সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার ৮৪৮ দশমিক ৮৬ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই চূড়ায় আরোহণ করেন। নেপালের পর্যটন বিভাগের কর্মকর্তা খিমলাল ঘটম্যান নিশ্চিত করেছেন যে, আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে থাকায় ওই দিন ভোর ৩টা থেকে আরোহণ শুরু হয় এবং টানা প্রায় ১১ ঘণ্টা ধরে এই সফল অভিযান চলে।
এর আগে ২০১৯ সালের ২২ মে নেপালের দক্ষিণ দিক (সাউথ কোল) ব্যবহার করে একদিনে সর্বোচ্চ ২২৩ জন আরোহী এভারেস্ট জয় করেছিলেন। দীর্ঘ সাত বছর পর সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন এই ইতিহাস তৈরি হলো।
চলতি বছর এভারেস্টে আরোহণ মৌসুমের সূচনা কিছুটা দেরিতে হয়েছে। পর্বত আরোহণের মূল পথে বিশাল আকৃতির বরফখণ্ড (আইসফল) জমে পথ অবরুদ্ধ হয়ে থাকায় রুট তৈরিতে বিলম্ব হয়। এছাড়া এ বছর চীনের তিব্বত অংশের উত্তর রুটটি বিদেশী পর্বতারোহীদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয় চীন কর্তৃপক্ষ। ফলে বিশ্বজুড়ে থাকা পর্বতারোহীদের সম্পূর্ণ চাপ এসে পড়ে নেপালের দক্ষিণ রুটের ওপর। এই পরিস্থিতির কারণে নেপাল সরকার এবার রেকর্ডসংখ্যক প্রায় ৫০০ বিদেশী আরোহীকে এভারেস্ট অভিযানের অনুমতি প্রদান করতে বাধ্য হয়, যা দেশটির ইতিহাসে একক মরসুমে সর্বোচ্চ অনুমতির রেকর্ড।
হিমালয় পর্বতমালা বিশেষজ্ঞরা এই অতিরিক্ত ভিড় এবং পর্বতারোহীদের সামগ্রিক নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন আলোকচিত্রে দেখা গেছে, তুষারঢাকা খাড়া ঢালে আরোহীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষারত রয়েছেন। বিশেষ করে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৮ হাজার মিটারের ঊর্ধ্বের অংশ, যা পর্বতারোহন বিদ্যায় ‘ডেথ জোন’ বা মৃত্যু অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, সেখানে ভিড়ের তীব্রতা ছিল সবচেয়ে বেশি।
এই চরম উচ্চতায় বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের মাত্রা অত্যন্ত কম থাকায় প্রায় সব পর্বতারোহীকে কৃত্রিম বা অতিরিক্ত অক্সিজেন সিলিন্ডারের ওপর নির্ভর করতে হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পর্বত বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চরম প্রতিকূল পরিবেশে কোনো মানুষের পক্ষে ২০ ঘণ্টার বেশি অবস্থান করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং প্রাণঘাতী হতে পারে। অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হলে আরোহীদের অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়ার এবং ফ্রস্টবাইটে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বহুগুণ বেড়ে যায়। তবে বাণিজ্যিক অভিযান পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো দাবি করেছে, পর্যাপ্ত অক্সিজেন মজুত এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে এই ভিড় বড় কোনো নিরাপত্তা সংকট তৈরি করে না।
নেপাল সরকার গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে এভারেস্ট আরোহণের অনুমতি ফি (পারমিট ফি) উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করেছে। আগের নির্ধারিত ১১ হাজার মার্কিন ডলার থেকে বাড়িয়ে এই ফি বর্তমানে ১৫ হাজার ডলারে উন্নীত করা হয়েছে। তা সত্ত্বেও বৈশ্বিক পর্বতারোহীদের মাঝে বিশ্বের সর্বোচ্চ চূড়া ছোঁয়ার আগ্রহ বা প্রবণতায় কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি।
চলতি মৌসুমের এই রেকর্ড ভাঙা দিনে অভিজ্ঞ ও নতুন—উভয় শ্রেণীর আরোহীরাই সাফল্যের মুখ দেখেছেন। এদের মধ্যে নেপালের বিখ্যাত গাইড কামি রিতা শেরপা ৩২তমবারের মতো এভারেস্টের চূড়ায় পা রেখে নিজেরই গড়া পূর্ববর্তী বিশ্বরেকর্ডটি নতুন করে ভেঙেছেন। একই দিনে লাকপা শেরপা নামের এক নেপালী নারী পর্বতারোহী ১১তমবারের মতো এভারেস্ট জয় সম্পন্ন করেন, যা বিশ্বজুড়ে নারী পর্বতারোহীদের মধ্যে এককভাবে সর্বোচ্চবার আরোহণের রেকর্ডকে আরও সুসংহত করল।
অর্থনৈতিক ও পর্যটন দৃষ্টিকোণ থেকে এই রেকর্ডসংখ্যক আরোহণ নেপালের রাজস্ব খাতে বড় অবদান রাখলেও, হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশ রক্ষা এবং পর্বতারোহীদের জীবন সুরক্ষায় আগামী দিনে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পারমিট ইস্যু নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।


