হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: আধুনিক রাডার প্রযুক্তিতে তিন মাসে রেকর্ড ১৯৯ কোটি টাকা আয়

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: আধুনিক রাডার প্রযুক্তিতে তিন মাসে রেকর্ড ১৯৯ কোটি টাকা আয়

অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন নতুন এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (এটিসি) টাওয়ার ও রাডার সিস্টেম চালুর পর ওভারফ্লাইং চার্জ আদায়ে রেকর্ড সাফল্য অর্জিত হয়েছে। চলতি ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে (জানুয়ারি-মার্চ) এই খাত থেকে সরকারের আয় হয়েছে ১৯৯ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮১০ টাকা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, উন্নত নজরদারি ব্যবস্থার কারণে দেশের আকাশসীমা ব্যবহারকারী বিদেশি উড়োজাহাজ থেকে রাজস্ব আদায়ের এই অঙ্ক গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিগত বছরগুলোর তুলনায় চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ওভারফ্লাইং চার্জ আদায়ে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪ সালের প্রথম তিন মাসে এই খাত থেকে আয় ছিল ১৫৭ কোটি ১৫ লাখ টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ১৮৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকায়। ফলে গত ২০২৪ সালের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ৪২ কোটি টাকারও বেশি। খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এই প্রবৃদ্ধিকে দেশের এভিয়েশন খাতের জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখছেন।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের আকাশসীমা, বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরসংলগ্ন একটি বিশাল অঞ্চল সনাতন পদ্ধতির কারণে পুরোপুরি নিবিড় নজরদারির আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছিল না। এর ফলে বহু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ফ্লাইট বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রিত আকাশসীমা (ফ্লাইট ইনফরমেশন রিজিয়ন বা এফআইআর) ব্যবহার করলেও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে তাদের কাছ থেকে সঠিকভাবে ওভারফ্লাইং ফি বা উড্ডয়ন মাসুল আদায় করা যেত না। নতুন রাডার ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার ফলে এই ফাঁকফোকরগুলো সম্পূর্ণ বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ জানান, অতীতে বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে চলাচলকারী বিদেশি উড়োজাহাজগুলোর অবস্থান নিখুঁতভাবে শনাক্তকরণে কিছুটা সীমাবদ্ধতা ছিল। আধুনিক প্রযুক্তি স্থাপনের ফলে এখন দেশের আকাশসীমায় প্রবেশ করা প্রতিটি ফ্লাইটের ওপর সার্বক্ষণিক ও সুনির্দিষ্ট নজরদারি নিশ্চিত করা যাচ্ছে। এতে করে কোনো ফ্লাইট ফি না দিয়ে পার পাওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়েছে এবং রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

কৌশলগত এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বিশ্লেষণের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে আধুনিক রাডার সিস্টেমসহ এই নতুন এটিসি টাওয়ারের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। এরপর গত ২০ এপ্রিল বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী আফরোজা খানম আনুষ্ঠানিকভাবে এই আধুনিক ব্যবস্থার উদ্বোধন করেন। নতুন এই ব্যবস্থাপনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে শক্তিশালী ‘এস-ব্যান্ড প্রাইমারি রাডার’, যা ৮০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত এবং ‘মোড-এস সেকেন্ডারি রাডার’, যা প্রায় ২০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত আকাশসীমা সুনির্দিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম। এর ফলে দেশের সম্পূর্ণ আকাশসীমার পাশাপাশি সমুদ্রসীমার ওপর দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক রুটের উড়োজাহাজগুলোকেও সার্বক্ষণিক ট্র্যাকিংয়ের আওতায় আনা হয়েছে।

এই মেগা প্রকল্পটি বাংলাদেশ সরকারের দূরদর্শী অর্থনৈতিক পরিকল্পনার একটি অংশ। ফ্রান্সের খ্যাতনামা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘থ্যালেস’-এর কারিগরি সহায়তায় এবং সরকারি পর্যায়ে (জি-টু-জি) চুক্তির ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হয়েছে। সম্পূর্ণ প্রকল্পটিতে ব্যয় হয়েছে ৯৪২ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই বিশাল ব্যয়ের পুরো অর্থায়নই বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (সিএএবি) তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থান করেছে, যা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে বাড়তি কোনো চাপ সৃষ্টি করেনি।

এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই আধুনিকায়নের ফলে কেবল সরকারের রাজস্ব আয়ই বাড়বে না, বরং আন্তর্জাতিক সিভিল এভিয়েশন অর্গানাইজেশন (আইসিএও)-এর মানদণ্ডে বাংলাদেশের আকাশসীমার নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা অনেক বৃদ্ধি পাবে। নিরাপদ ও নিখুঁত এয়ার ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কারণে আগামী দিনগুলোতে বাংলাদেশের আকাশসীমা ব্যবহারে আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসগুলোর আগ্রহ আরও বাড়বে, যা দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ