ট্রাম্পের যুদ্ধ ক্ষমতা সীমিত করতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব পাস

ট্রাম্পের যুদ্ধ ক্ষমতা সীমিত করতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে প্রস্তাব পাস

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

ইরানে কংগ্রেসের পূর্বানুমোদন ছাড়া সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করতে একটি ঐতিহাসিক প্রস্তাব পাস করেছে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ (হাউস অব রিপ্রেজেন্টিটিভস)। স্থানীয় সময় বুধবার (৩ জুন) ওয়াশিংটনে ডেমোক্র্যাটদের আনা ‘ওয়ার পাওয়ারস’ বা যুদ্ধ ক্ষমতা সংক্রান্ত এই প্রস্তাবটি ২১৫-২০৮ ভোটের ব্যবধানে পাস হয়। আইনসভার উভয় কক্ষে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকান দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও এই প্রস্তাবের পক্ষে চারজন রিপাবলিকান সদস্য ভোট দেওয়ায় একে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জন্য একটি বড় ধরনের রাজনৈতিক ও কৌশলগত ধাক্কা হিসেবে দেখছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।

প্রতিনিধি পরিষদে পাস হওয়া এই প্রস্তাবে মার্কিন কংগ্রেসের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক সংঘাত ও যুদ্ধ বন্ধের জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুযায়ী, এককভাবে কোনো দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার চূড়ান্ত ক্ষমতা একমাত্র কংগ্রেসের হাতেই ন্যস্ত। তবে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ উদ্যোগে ইরানের বিরুদ্ধে আকস্মিক বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা এড়িয়ে চলছেন। হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে এই যুদ্ধকে একটি ‘ছোটখাটো সংঘর্ষ’ বা ‘স্বল্পমেয়াদি সামরিক অভিযান’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হলেও, কোনো আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে এই ধরনের বড় মাত্রার সংঘাত প্রলম্বিত করায় মার্কিন আইনপ্রণেতাদের একটি বড় অংশের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

বুধবারের এই ভোটাভুটি ছিল চলতি বছরে ইরানের বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ ক্ষমতা সীমিত করার লক্ষ্যে প্রতিনিধি পরিষদের চতুর্থবারের মতো প্রচেষ্টা। এর আগে তিনবার একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রিপাবলিকানদের কঠোর অবস্থানের কারণে তা সামান্য ব্যবধানে ব্যর্থ হয়েছিল। তবে প্রতিবারই ভোটের ব্যবধান ক্রমান্বয়ে কমছিল, যা শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটদের এই জয়ে রূপ নেয়। এর আগে গত ২১ মে কংগ্রেসের মেমোরিয়াল ডে অবকাশ শুরুর ঠিক আগের দিন এই প্রস্তাবের ওপর ভোট হওয়ার কথা থাকলেও রিপাবলিকানদের দলীয় কোন্দল এবং ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দেওয়ার আশঙ্কায় হাউসের স্পিকার ও ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র মাইক জনসন নির্ধারিত সময়ের আগেই অধিবেশন মুলতবি করে ভোটটি বাতিল করেছিলেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি, এবং বুধবার টমাস ম্যাসি, ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক, ওয়ারেন ডেভিডসন ও টম ব্যারেট নামের চার রিপাবলিকান সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সাথে সুর মিলিয়ে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন।

যদিও রাজনৈতিক ও প্রতীকী অর্থে এটি ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ধরনের পরাজয়, তবে এই প্রস্তাবটি সরাসরি আইনে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা এই মুহূর্তে বেশ কম। মার্কিন আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী, কোনো বিল বা প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে কার্যকর হতে হলে তা আইনসভার উচ্চকক্ষ সিনেটেও পাস হতে হবে। তবে সিনেটে এটি পাস হলেও প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এতে নিজের বিশেষ ক্ষমতা বা ‘ভেটো’ প্রয়োগ করে তা বাতিল করে দিতে পারেন। প্রেসিডেন্টের সেই ভেটো ক্ষমতাকে অকার্যকর বা অতিক্রম করতে হলে মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষে (প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট) দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ব্যাপক সমর্থনের প্রয়োজন হয়, যা বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে অর্জন করা ডেমোক্র্যাটদের জন্য প্রায় অসম্ভব।

চলমান এই সামরিক সংঘাতের পটভূমি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই ইরান-আমেরিকা যুদ্ধ আগামী শনিবার ১০০তম দিনে পদার্পণ করতে যাচ্ছে। যদিও গত ৮ এপ্রিল থেকে উভয় পক্ষের মধ্যে এক ধরনের সাময়িক ও ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, তবুও এই সময়ের মধ্যে কোনো পক্ষই পুরোপুরি শান্ত থাকেনি। যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে গত কয়েক সপ্তাহেও মার্কিন ও ইরানি বাহিনী একে অপরের ওপর একাধিকবার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন আইনসভার নিম্নকক্ষে পাস হওয়া এই যুদ্ধ ক্ষমতা প্রস্তাবটি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগ্রাসী বিদেশনীতির বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির একটি বড় ধরনের প্রতিরোধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ সংবাদ