জাতীয় ডেস্ক
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা এবং ডিজিটাল অর্থনীতিসহ বহুমুখী ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ। একই সঙ্গে আগামী ২০২৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এমবিএফটিএ) চূড়ান্ত করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) মালয়েশিয়া সফররত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে প্রকাশিত ৩৩ দফার একটি যৌথ বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়।
এর আগে সকালে কুয়ালালামপুরে দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে এক একান্ত ও প্রতিনিধি পর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ের পাশাপাশি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, দক্ষিণ এশিয়ায় মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার বাংলাদেশ। দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান এই বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও সুসংহত এবং বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে উভয় পক্ষ তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
বিবৃতিতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এমবিএফটিএ) স্বাক্ষরের লক্ষ্যে চলমান আলোচনার অগ্রগতিতে সন্তোষ প্রকাশ করা হয়। ২০২৭ সালের মধ্যে এই চুক্তি চূড়ান্ত রূপ পেলে দুই দেশের মধ্যকার শুল্ক ও বাণিজ্য বাধাগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, যা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেবে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন। এছাড়া দুই দেশের বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি সংযোগ এবং সহযোগিতা বাড়াতে ‘মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ জয়েন্ট বিজনেস কাউন্সিল’ গঠনের অগ্রগতির বিষয়টিও যৌথ বিবৃতিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই দেশের শীর্ষ নেতারা বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার আওতায় নিয়মিত সংলাপ ও উচ্চপর্যায়ের সফর বিনিময়ের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এর অংশ হিসেবে দীর্ঘ দিন ধরে অমীমাংসিত থাকা যৌথ কমিশন বৈঠক (জেসিএম) এবং দ্বিপাক্ষিক আলোচনা (বিসি) দ্রুত পুনরায় চালুর বিষয়ে দুই দেশ ঐকমত্যে পৌঁছেছে। এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়াগুলো সচল হলে শ্রমবাজারের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা এবং অন্যান্য অমীমাংসিত সংকট দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রযুক্তিগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে এবারের যৌথ বিবৃতিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ফিনটেক, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল গভর্ন্যান্স এবং অন্যান্য উদীয়মান প্রযুক্তি খাতে পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। মালয়েশিয়াকে বাংলাদেশের হাই-টেক পার্ক, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং ডিজিটাল অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে, সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে মালয়েশিয়ার দীর্ঘদিনের বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা এবং বাংলাদেশের দ্রুত বিকাশমান তথ্যপ্রযুক্তি ও প্রকৌশল খাতের সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একটি সমন্বিত মানবসম্পদ উন্নয়ন কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে বাংলাদেশের তরুণ আইটি প্রকৌশলীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের কর্মসংস্থান ও দক্ষতার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত ২১ জুন সরকারি সফরে মালয়েশিয়া পৌঁছান। দ্বিপাক্ষিক এই সফর শেষে সোমবারই তার মালয়েশিয়া থেকে চীনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। আগামী ২৬ জুন চীন সফর সমাপ্ত করে প্রধানমন্ত্রীর দেশে ফেরার সূচি নির্ধারিত রয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর এই ধারাবাহিক এশীয় সফর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণে দীর্ঘমেয়াদি ও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।


