আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য

আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য

অর্থ-বাণিজ্য ডেস্ক

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে দেশের মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। একই সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে সামাজিক নিরাপত্তা এবং খাদ্যনিরাপত্তা খাতে বড় অঙ্কের বরাদ্দসহ বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে টেবিলে উত্থাপিত এক লিখিত প্রশ্নোত্তরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই তথ্য জানান। নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. ফজলে হুদার এক প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী সরকারের এই অর্থনৈতিক পরিকল্পনা ও দেশের উত্তরাঞ্চলের অনুন্নত এলাকার অবকাঠামো উন্নয়নে গৃহীত পদক্ষেপগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

সংসদকে জানানো হয়, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সুরক্ষা এবং অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নকে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে সরকারের আর্থিক ও মুদ্রানীতির মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, বাজেট ঘাটতি সহনীয় পর্যায়ে রাখা, অগ্রাধিকারভিত্তিক ব্যয় ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার সমন্বিত পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

নিম্ন আয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জীবিকা রক্ষায় সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি জোরদার করার বিষয়টি উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী জানান, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় ৪১ লাখ নারীকে প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে সহায়তা প্রদানের জন্য ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচির আওতায় দেশের ১০০টি উপজেলায় ৪২ লাখ ৫০ হাজার কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার জন্য প্রস্তাবিত বরাদ্দ ১ হাজার ৬২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এসব উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য হলো মূল্যস্ফীতির চাপের মুখে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষের হাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিয়ে তাদের ভোগক্ষমতা সচল রাখা।

খাদ্যপণ্যের মূল্য সহনীয় রাখতে সরকারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির বিবরণ দিয়ে অর্থমন্ত্রী জানান, কর্মাভাবকালীন ৬ মাসে ৫৫ লাখ উপকারভোগী পরিবারকে প্রতি কেজি ১৫ টাকা দরে মাসে ৩০ কেজি করে চাল দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া, দেশব্যাপী ১ হাজারেরও বেশি বিক্রয়কেন্দ্রের মাধ্যমে ভর্তুকিমূল্যে চাল ও আটা সরবরাহ সচল রাখা হয়েছে। চালের বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্দেশ্যে ৪১৯টি উপজেলায় অতিরিক্ত ওএমএস (খোলা বাজারে বিক্রি) কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, যেখানে প্রতি কেজি চাল ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা আরও সুসংহত করতে সরকারি খাদ্যশস্য ধারণক্ষমতা ২৩ লাখ ১৬ হাজার মেট্রিক টন থেকে বাড়িয়ে ২৪ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টনে এবং খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৩৮ লাখ ১৯ হাজার টন থেকে ৪১ লাখ ২৯ হাজার টনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের অনুন্নত এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাজেটে উত্তরাঞ্চলের জন্য আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট অঙ্ক উল্লেখ করা না হলেও সামগ্রিক ভৌত অবকাঠামো খাতে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৯৮৮ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়নের অংশ হিসেবে দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্পায়ন, বিশেষায়িত কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, কোল্ড-চেইন বা হিমাগার স্থাপন, সংরক্ষণাগার, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং লজিস্টিকস খাতের উন্নয়নে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক রূপান্তরের লক্ষ্যে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার আশা করছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, লক্ষ্যভিত্তিক সামাজিক সহায়তা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং আঞ্চলিক অবকাঠামোগত উন্নয়নের এই সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় স্বস্তি ফিরে আসবে।

অর্থ বাণিজ্য শীর্ষ সংবাদ