স্পোর্টস ডেস্ক
বিশ্বকাপ ফুটবলের হাইভোল্টেজ শেষ ষোলোর লড়াইয়ে আগামী মঙ্গলবার টেক্সাসের ডালাসে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে নরওয়ে ও আইভরি কোস্ট। কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার এই মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ফুটবলপ্রেমীদের মূল আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন নরওয়ের তারকা স্ট্রাইকার এরলিং হালান্ড। তবে আফ্রিকান পরাশক্তি আইভরি কোস্ট কেবল এই গোলমেশিনকে আটকানোর ছক কষছে না, বরং নিজেদের আক্রমণভাগের ধার দেখিয়ে নরওয়েকে কোণঠাসা করার ব্যাপারেও সমান আত্মবিশ্বাসী। দীর্ঘ ২৮ বছর পর বিশ্বমঞ্চে ফিরে নরওয়ের এমন দুর্দান্ত পথচলা এবং আইভরি কোস্টের ভারসাম্যপূর্ণ কৌশলের কারণে ম্যাচটি ঘিরে ফুটবল বিশ্বে ব্যাপক উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
চলতি বিশ্বকাপে নরওয়ের সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছেন এরলিং হালান্ড। আসরে মাত্র দুটি ম্যাচ খেলেই তিনি ইতিমধ্যে চার গোল করার অনন্য কীর্তি গড়েছেন। প্রথম ম্যাচে ইরাকের বিপক্ষে জোড়া গোল করে নিজের আগমনী বার্তা জানান দেওয়ার পর, দ্বিতীয় ম্যাচে শক্তিশালী সেনেগালের বিপক্ষেও দুইবার জালের দেখা পান ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার। তার এই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচের আগেই শেষ ষোলোর টিকিট নিশ্চিত করে ফেলে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দলটি। নকআউট পর্বের কথা মাথায় রেখে এবং খেলোয়াড়দের ক্লান্তি দূর করতে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে ফ্রান্সের বিপক্ষে হালান্ডসহ প্রথম একাদশের একাধিক নিয়মিত খেলোয়াড়কে বিশ্রামে রেখেছিলেন কোচ স্টালে সোলবাক্কেন।
আইভরি কোস্টের প্রধান কোচ এমের্স ফায়ে বেশ ভালোভাবেই জানেন যে, ম্যাচ জিততে হলে হালান্ডকে থামানোই হবে তাদের রক্ষণভাগের প্রধানতম দায়িত্ব। ম্যাচ-পূর্ববর্তী কৌশলগত পরিকল্পনায় আইভরি কোস্টের মূল লক্ষ্য থাকবে নরওয়ের মাঝমাঠ থেকে হালান্ডের কাছে আসা বলের জোগান বন্ধ করা এবং তাকে সার্বক্ষণিক কঠোর পাহারায় রাখা। এই কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বটি সফলভাবে পালন করার জন্য ফায়ে ভরসা রাখছেন ২২ বছর বয়সী উদীয়মান রক্ষণভাগের ফুটবলার ওসমান দিয়োমান্দের ওপর। ইউরোপের শীর্ষ সারির ক্লাবগুলোর নজর কাড়া এই তরুণ ডিফেন্ডারের জন্য মঙ্গলবারের ম্যাচটি নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
তবে কেবল রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে নরওয়েকে পার করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন আইভরি কোস্টের রণকৌশলী এমের্স ফায়ে। প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে আইভরি কোস্টের আক্রমণভাগকেও সমভাবে প্রস্তুত করা হয়েছে। দলটির ফরোয়ার্ড লাইনে রয়েছে বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান ফুটবলার, যাদের মধ্যে তরুণ ইয়ান দিয়োমান্দে ইতিমধ্যেই ফুটবল বোদ্ধাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। পাশাপাশি অভিজ্ঞ উইঙ্গার নিকোলা পেপেও তার চেনা ছন্দ ফিরে পেয়েছেন, যা দলের জন্য বড় একটি স্বস্তির খবর। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে সর্বশেষ গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে পেপের জোড়া গোল আইভরি কোস্টকে বড় জয় এনে দিয়েছিল এবং দলের আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
আইভরি কোস্টের স্কোয়াডে আক্রমণভাগে খেলার জন্য মোট নয়জন দক্ষ ফুটবলার রয়েছেন, যা দলটির ফরোয়ার্ড লাইনের গভীরতা প্রমাণ করে। এদের মধ্যে অন্যতম তরুণ উইঙ্গার আঁজে-ইওয়ান বনি, যিনি বিশ্বকাপের ঠিক আগমুহূর্তে ফ্রান্সের পরিবর্তে নিজের পিতৃভূমি আইভরি কোস্টের হয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। কোচ ফায়ে মনে করেন, কোনো একক খেলোয়াড়ের ওপর গোল করার জন্য নির্ভরশীল না থাকাই তাদের দলের সবচেয়ে বড় শক্তি। দলগত সমন্বয়ের ওপর জোর দিয়ে তিনি জানান যে, তাদের দলে একাধিক খেলোয়াড়ের গোল করার সক্ষমতা রয়েছে, যা প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য আক্রমণ সামলানো কঠিন করে তোলে। এমনকি বেঞ্চ থেকে আসা বদলি খেলোয়াড়রাও যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে সক্ষম।
অন্যদিকে নরওয়ে শিবিরের কোচ স্টালে সোলবাক্কেন তার খেলোয়াড়দের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বেশ সন্তুষ্ট। ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচে একাদশের ১০ জন নিয়মিত খেলোয়াড়কে মাঠের বাইরে রাখার সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ যৌক্তিক ও প্রয়োজনীয় বলে পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। সেনেগালের বিরুদ্ধে অত্যন্ত শারীরিক ও মানসিক চাপযুক্ত ম্যাচ খেলার পর দলের রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠের ফুটবলাররা ক্লান্তিতে ভুগছিলেন। নকআউট পর্বের মতো হাই-ইনটেনসিটি ম্যাচের আগে ফুটবলারদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সতেজ রাখাটাই ছিল সোলবাক্কেনের প্রধান লক্ষ্য। বিশ্রামের পর নরওয়ের মূল স্কোয়াড এখন পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নামার জন্য প্রস্তুত।
ডালাসের আবহাওয়া নিয়ে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ নরওয়ের কিছুটা অস্বস্তি থাকার কথা থাকলেও, সেটি নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত নন কোচ সোলবাক্কেন। ম্যাচটি দিনের আলোতে অনুষ্ঠিত হলেও সম্পূর্ণ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আধুনিক স্টেডিয়ামে খেলা হওয়ার কারণে গরম বা আর্দ্রতা খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্সে কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। সব মিলিয়ে একদিকে থাকছে হালান্ডের গোল করার বিধ্বংসী ক্ষমতা ও নরওয়ের গতিময় ফুটবল, আর অন্যদিকে থাকছে আইভরি কোস্টের সুসংগঠিত রক্ষণ ও বৈচিত্র্যময় আক্রমণভাগ। মাঠের লড়াইয়ে কৌশল আর শক্তির এই চরম সংঘাত একটি স্মরণীয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচের আভাস দিচ্ছে।


