সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৩১ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিতর্ক

সংসদে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৩১ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিতর্ক

সংসদীয় ডেস্ক

জাতীয় সংসদে তীব্র বাদানুবাদ ও বিরোধী দলের ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর দীর্ঘ আলোচনা শেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য প্রস্তাবিত ৩১ হাজার ৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকার বাজেট বরাদ্দ কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। মঙ্গলবার বাজেটের দায়যুক্ত ব্যয় ব্যতীত অন্যান্য ব্যয় সম্পর্কিত মঞ্জুরি দাবির ওপর আলোচনা শেষে এই অনুমোদন দেওয়া হয়। অধিবেশনে দেশের বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, অপরাধের পরিসংখ্যান এবং বিচারিক প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সাফল্যের দাবি করা হলেও বিরোধী সংসদ সদস্যরা এর তীব্র সমালোচনা করেন।

সংসদ অধিবেশনে বাজেট বরাদ্দের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দাবি করেন, বিগত ১০-১৫ বছরের তুলনায় এবং বিশেষ করে ২০২৫ সালের চেয়ে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঐতিহাসিক উন্নতি হয়েছে। সম্প্রতি সংসদে উত্থাপিত খাতভিত্তিক অপরাধের পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অধিকাংশ সূচকে অপরাধের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। বিরোধী সদস্যদের বিভিন্ন সমালোচনার জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, ধর্ষণ মামলার সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, অতীতে সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে নারীরা থানায় মামলা করতে পারতেন না। বর্তমানে অনলাইনে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং থানায় সরাসরি প্রথম তথ্য বিবরণী (এফআইআর) দায়েরের প্রক্রিয়া সহজ ও বাধাহীন করায় মামলার নথিভুক্তির সংখ্যা বেড়েছে, যা প্রকারান্তরে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করার একটি লক্ষণ।

নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার নিশ্চিতকরণে সরকারের পদক্ষেপসমূহ তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রামিসা হত্যা মামলার বিচারকার্য মাত্র ১৭ দিনে সম্পন্ন হয়েছে, যা দেশের বিচারিক ইতিহাসে একটি নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত। এছাড়া দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত তনু হত্যা মামলায় ডিএনএ প্রযুক্তির সহায়তায় আসামি শনাক্ত ও গ্রেফতারের মাধ্যমে অপরাধ দমনে বিজ্ঞানভিত্তিক তদন্তের অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান প্রশাসন অপরাধীকে দলীয় পরিচয়ে বিচার করে না, বরং আইনি প্রক্রিয়া বাস্তবায়নে শতভাগ নিরপেক্ষতা বজায় রাখছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে আরও আধুনিকীকরণের ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী জানান, বিভাগটিতে ডগ স্কোয়াড, উন্নত ল্যাবরেটরি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সরঞ্জাম যুক্ত করা হচ্ছে। একই সাথে, অনলাইন জুয়া ও সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় ১৮৬৭ সালের পুরোনো আইন সংশোধন করে একটি যুগোপযোগী ও কঠোর জুয়া প্রতিরোধ আইন প্রণয়নের উদ্যোগ চলমান রয়েছে।

এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই বিপুল অঙ্কের বাজেট বরাদ্দের বিরোধিতা করে ছাঁটাই প্রস্তাব পেশ করেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। দেশের ক্রমবর্ধমান অপরাধের চিত্র তুলে ধরে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি পরিসংখ্যানগত তথ্য দিয়ে জানান, সাম্প্রতিক মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাসেই দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ এবং ২,২১৪টি চুরির ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া এই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনা এবং ৩,৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। তিনি দাবি করেন, দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা ঘটছে, যা জননিরাপত্তার চরম অবনতি নির্দেশ করে।

রুমিন ফারহানা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য প্রদানের শৈলীর প্রশংসা করলেও মাঠপর্যায়ে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি মন্তব্য করেন, দেশের এমন নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতির মধ্যে ৩১ হাজার কোটি টাকার বেশি বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হলেও জননিরাপত্তার কতটুকু উন্নয়ন হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। যদি এই মন্ত্রণালয় কার্যকরভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারত, তবে বাজেট ছাঁটাইয়ের প্রয়োজন হতো না।

এর জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিরোধী সংসদ সদস্যের বক্তব্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে পরিহাসের ছলে বলেন, বিগত দিনে সংসদে দেশের খাতওয়ারি অপরাধের যে নিম্নমুখী চিত্র এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির বিস্তারিত পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছিল, তা হয়তো বিরোধী দলীয় সদস্য লক্ষ্য করেননি। দ্বিপাক্ষিক এই আলোচনা ও যুক্তিতর্কের পর বিরোধী সদস্যদের উত্থাপিত সকল ছাঁটাই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায় এবং প্রস্তাবিত মূল বাজেটটি পাস হয়।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ