জাতীয় ডেস্ক
দেশের মোট জনসংখ্যার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এখনো জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর আর্সেনিক দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে এই ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছেন দেশের প্রায় ১১ শতাংশ মানুষ। তবে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন প্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে চলতি ২০২৬ সালের মধ্যে এই হার ৫ থেকে ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের লিখিত জবাবে এই তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী দেশের আর্সেনিক পরিস্থিতির এই চিত্র ও সরকারের কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন।
স্থানীয় সরকারমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং জাতিসংঘের শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর যৌথ জরিপ প্রতিবেদন ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০১৯’ অনুযায়ী এই ১১ শতাংশ মানুষ আর্সেনিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে আর্সেনিক দূষণ থেকে রক্ষা করতে এবং নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা দিতে সরকারের স্থানীয় সরকার বিভাগের আওতাধীন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই) দেশব্যাপী নানামুখী পদক্ষেপ ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।
সংসদকে জানানো হয়, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলে চলমান ও সমাপ্ত বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় ২০২৬ সালের মধ্যে দেশজুড়ে প্রায় ১২ লাখ ১৫ হাজার ৯৪৮টি আর্সেনিকমুক্ত নিরাপদ পানির উৎস স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। আর্সেনিক কবলিত এলাকাগুলোতে শুধু প্রথাগত গভীর নলকূপ স্থাপনের মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। ভৌগোলিক অবস্থান ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর বিবেচনা করে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (রেন ওয়াটার হার্ভেস্টিং) প্রযুক্তি এবং স্থানীয় পুকুর খনন ও পুনঃখনন করে সৌরচালিত ‘পন্ড স্যান্ড ফিল্টার’ (পিএসএফ) স্থাপন করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব ও টেকসই এই প্রযুক্তিসমূহ ব্যবহারের ফলে দেশের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলোতে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
লিখিত বক্তব্যে মন্ত্রী সরকারের পাঁচাট বিশেষ প্রকল্পের অগ্রগতি ও সফলতার বিশদ পরিসংখ্যান তুলে ধরেন:
প্রথমত, দেশব্যাপী সুপেয় পানি নিশ্চিত করতে চলমান ‘সমগ্র দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’-এর আওতায় এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি তথা ৬ লাখ ১৫ হাজার ৪৯৭টি নিরাপদ পানির উৎস স্থাপন করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও উপকূলীয় জেলাগুলোতে যেখানে ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা ও আর্সেনিকের মাত্রা বেশি, সেখানে বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ‘উপকূলীয় জেলাসমূহে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্প’-এর মাধ্যমে এ পর্যন্ত ১ লাখ ৯৯handle হাজার ৪৮৫টি উৎস প্রস্তুত করা হয়েছে।
এছাড়া, আর্সেনিক সমস্যা সমাধানে বিশেষায়িত প্রকল্প ‘পানি সরবরাহে আর্সেনিক ঝুঁকি নিরসন প্রকল্প’ সফলভাবে সমাপ্ত হয়েছে, যার অধীনে ১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৭৬টি পানির উৎস তৈরি করা হয়েছিল। পাশাপাশি সমাপ্ত হওয়া ‘পল্লী অঞ্চলে পানি সরবরাহ প্রকল্প’-এর আওতায় ৮৮ হাজার ২৩৫টি এবং ‘অগ্রাধিকারমূলক গ্রামীণ পানি সরবরাহ প্রকল্প’-এর আওতায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৫৫টি নিরাপদ পানির উৎস গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আর্সেনিকযুক্ত পানি দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারের ফলে মানবদেহে মেলানোসিস, কেরাটোসিসসহ নানা চর্মরোগ এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। সরকারের এই সমন্বিত পদক্ষেপ ও লক্ষ্যমাত্রা সঠিক সময়ে বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ জনপদে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা করা হচ্ছে।


