প্রান্তিক পর্যায়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ নির্ণয়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

প্রান্তিক পর্যায়ে মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা ও রোগ নির্ণয়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণে কাজ করছে সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

স্বাস্থ্য ডেস্ক

দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য সঠিক রোগ নির্ণয় ব্যবস্থা এবং মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতিগুলো পূরণে সরকার নিবিড়ভাবে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, গ্রামীণ পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্য কাঠামোর প্রসার অপরিহার্য এবং এ লক্ষ্য অর্জনে সরকার নানামুখী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।

আজ রবিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘निम्न ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার জন্য উপযুক্ত প্রযুক্তি’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এসব কথা বলেন। দেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন এবং সর্বস্তরের মানুষের জন্য চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দেশের তৃণমূল পর্যায়ের চিকিৎসাসেবার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, দেশের প্রান্তিক অঞ্চলের রোগীরা এখনও কাঙ্ক্ষিত ও সঠিক চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই পরিস্থিতির দ্রুত ও টেকসই উন্নতি ঘটাতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। চিকিৎসাসেবার এই রূপান্তরকে বেগবান করতে এবং স্বাস্থ্য খাতের অবকাঠামোগত ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকার চলতি বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করেছে। এই বাড়তি বরাদ্দ গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে দেশে চলমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী। তিনি জানান, বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর অতিরিক্ত চাপের কারণে হাসপাতালগুলোকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। দেশের কিছু কিছু হাসপাতালে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগী ভর্তির কারণে একটি কক্ষের মধ্যেই ৩০ থেকে ৪০ জন ডেঙ্গু রোগীকে স্থান দিয়ে চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্সসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের আরও ধৈর্য, সহনশীলতা এবং সর্বোচ্চ পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে মন্ত্রী কঠোর নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীরা সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত কোনো অবস্থাতেই যেন তাদের হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র (ডিসচার্জ) দেওয়া না হয়।

চিকিৎসা খাতে দেশীয় প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও গবেষণার প্রতি সরকারের পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করে মন্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান টেলিমেডিসিন কর্মসূচির ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, এই প্ল্যাটফর্মে অনলাইন ১২-লিড ইসিজি ও ইলেকট্রনিক স্টেথোস্কোপের মতো আধুনিক ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি যুক্ত রয়েছে, যা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত কার্যকর। সরকারের নতুন গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা কর্মসূচির সঙ্গে এই দেশীয় প্রযুক্তিগুলোর কার্যকর সমন্বয় করা সম্ভব হলে গ্রামীণ স্বাস্থ্য খাতের দৃশ্যপটে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। উচ্চপ্রযুক্তির যথাযথ ও সুষম ব্যবহারের মাধ্যমে রোগ নির্ণয় ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক ও নির্ভুল করাই এখন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল ফিজিক্স অ্যান্ড টেকনোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বায়োমেডিকেল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির ক্লিনিক্যাল অনকোলজি বিভাগ, বাইবিট লিমিটেড এবং রিলেভেন্ট সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি সোসাইটি যৌথভাবে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করে।

উদ্বোধনী অধিবেশনে সম্মেলনের সভাপতি অধ্যাপক খোন্দকার সিদ্দিক-ই রব্বানী দেশে ১৯৭৮ সাল থেকে শুরু হওয়া স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি উদ্ভাবনের দীর্ঘ ইতিহাস ও অগ্রগতি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। অন্যদিকে, সম্মেলনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক তৌফিক হাসান বুয়েটে উদ্ভাবিত বিভিন্ন আধুনিক বায়োমেডিকেল প্রযুক্তি এবং এই খাতে নতুন উদ্যোক্তা তৈরির সম্ভাবনা ও নানা উদ্যোগের বিষয়ে আলোকপাত করেন।

সম্মেলনের বিভিন্ন কারিগরি অধিবেশনে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর স্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উপযুক্ত প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বিষদ আলোচনা হয়। এর মধ্যে প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ প্রতিরোধ, ওরাল রিহাইড্রেশন কর্মসূচি, শিশুদের স্নায়ুবিক বিকাশজনিত সমস্যা, ড্রাই আই চিকিৎসা, ডায়াবেটিক ফুট আলসার প্রতিরোধ, চিকিৎসাক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ইলেকট্রিক্যাল বায়ো-ইম্পিডেন্সের প্রয়োগ এবং স্বল্পমূল্যের দেশীয় চিকিৎসা প্রযুক্তি উদ্ভাবনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

এ ছাড়া, উন্নয়নশীল দেশগুলোর চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রযুক্তিগত বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে সম্মেলনে দুটি আন্তর্জাতিক উদ্যোগ গ্রহণের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। প্রস্তাবিত উদ্যোগ দুটি হলো— ‘গ্লোবাল ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্রোপ্রিয়েট টেকনোলজি ফর ম্যানকাইন্ড’ এবং ‘গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইকুয়ালাইজিং অ্যাক্সেস টু হেলথকেয়ার টেকনোলজি’।

আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের দ্বিতীয় ও সমাপনী দিনে ক্যানসার চিকিৎসা, প্যালিয়েটিভ কেয়ার, হাসপাতালজনিত সংক্রমণ প্রতিরোধ, কম খরচের আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং স্বাস্থ্যসেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ কারিগরি ও বৈজ্ঞানিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ