অর্থ ও বাণিজ্য ডেস্ক
সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধির মাধ্যমে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা এবং এ সংক্রান্ত আর্থিক চাপ হ্রাস করতে চায় সরকার। তবে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেন সাধারণ ভোক্তার ওপর বাড়তি মূল্যের বোঝা চেপে না বসে, সেদিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। সরকারের নীতিনির্ধারকদের মতে, বিগত সময়ের তৈরি হওয়া জ্বালানি খাতের দায়দেনা পরিশোধে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ একটি কার্যকর বিকল্প হতে পারে।
সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানী ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’ শীর্ষক এক নাগরিক সংলাপে এসব তথ্য ও নীতিগত অবস্থানের কথা জানানো হয়। সংলাপে সরকারি প্রতিনিধি, বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তা এবং ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত থেকে দেশের জ্বালানি খাতের বর্তমান সংকট ও ভবিষ্যৎ রূপরেখা নিয়ে আলোচনা করেন।
সংলাপে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু জানান, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতের একটি বড় অংশ এখন বেসরকারি খাতের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। বর্তমানে মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৮০ শতাংশই বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। বিগত সময়ে সম্পাদিত বেশ কিছু দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির কারণে সরকারকে উচ্চ মূল্যে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে।
মন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন, বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ উৎপাদনকারীদের বকেয়া পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা না গেলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এই ধারাবাহিকতায় উৎপাদন সচল রাখার স্বার্থে এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে সাম্প্রতিক সময়ে বাধ্য হয়ে বিদ্যুতের মূল্য পুনর্নির্ধারণ বা বৃদ্ধি করতে হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে এবং আমদানি করা জ্বালানি যেমন—তেল, গ্যাস ও কয়লার ওপর নির্ভরতা কমাতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। তবে নতুন এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় যেন বিদ্যুতের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে না যায়, সে বিষয়ে সরকার সতর্ক রয়েছে।
নাগরিক সংলাপে অংশ নিয়ে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম সরকারের এই উদ্যোগের বিষয়ে কিছু পর্যবেক্ষণ ও সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত ‘নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৬-২০৩০)’-এ বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি এবং উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলেও, সাধারণ ভোক্তার স্বার্থ সুরক্ষার বিষয়টি এখনও অনিশ্চিত রয়ে গেছে।
অধ্যাপক শামসুল আলম জোর দিয়ে বলেন, এই কৌশলপত্রটি চূড়ান্ত রূপ দেওয়ার আগে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে একটি সাশ্রয়ী ও যৌক্তিক মূল্য কাঠামো নির্ধারণ, আইনি প্রতিকারের ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। তিনি মনে করেন, খাতটিতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না হলে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। একই সাথে সৌরবিদ্যুৎ খাতে শতভাগ বেসরকারি বিনিয়োগ নিশ্চিত করার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন, যাতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি না হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে বাংলাদেশের জন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ধাবিত হওয়া সময়ের দাবি। তবে এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ের পাশাপাশি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকার পাশাপাশি জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে থাকে।


