জাতীয় ডেস্ক
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে একমাত্র কার্যকর বিকল্প হিসেবে চিহ্নিত করেছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে এই উৎস থেকে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সোমবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ) মিলনায়তনে কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) আয়োজিত ‘জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র’ শীর্ষক নাগরিক সংলাপে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু এই তথ্য জানান।
মন্ত্রী জানান, পূর্ববর্তী সরকারের সময় নেওয়া বিভিন্ন অপরিকল্পিত প্রকল্প এবং বিপুল আর্থিক দায়ের কারণে বর্তমান খাতটি একটি জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হিসেবে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই পরিবেশবান্ধব এই জ্বালানির প্রসারে প্রতিশ্রুতবদ্ধ এবং সরকার ইতিমধ্যে এই খাতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে ট্যাক্স সুবিধা বা কর রেয়াত প্রদান করেছে। বর্তমানে যেভাবে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে আসছেন, তাতে ২০৩০ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে। এই লক্ষ্য পূরণ হলে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে, যা দেশের অর্থনীতি ও বিদ্যুৎ খাতে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে।
বিদ্যুৎ খাতের সংস্কার ও উৎপাদন ব্যবস্থার বিষয়ে মন্ত্রী তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করে জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো কৌশলগত ক্ষেত্র বেসরকারি খাতের হাতে ছেড়ে দেওয়ার পক্ষে তিনি নন। বেসরকারি খাত মূলত মুনাফাকেন্দ্রীক ব্যবসা পরিচালনা করে, পক্ষান্তরে সরকারি ব্যবস্থাপনায় উৎপাদন করা হলে মুনাফাহীনভাবে জনগণকে সাশ্রয়ী মূল্যে সেবা দেওয়া সম্ভব। তবে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হলে আরও ভালো সেবা নিশ্চিত করা যেত বলে তিনি মন্তব্য করেন। রুফটপ বা ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা তুলে ধরে তিনি বলেন, ক্যাবল টিভি অপারেটরদের মতো স্থানীয় নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যদি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিল আদায়ের ব্যবস্থা করা যায়, তবে রুফটপ সোলার অত্যন্ত কার্যকর হবে। প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ মাত্র ৭ টাকায় সরবরাহ করা সম্ভব হলে তা সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য বড় স্বস্তি বয়ে আনবে।
সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য জমির সংকট প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে জানানো হয়, বর্তমান সরকার কৃষি জমি সুরক্ষায় অত্যন্ত সচেতন। অতীতের অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইপিজেড) স্থাপনসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কারণে প্রচুর কৃষি জমি নষ্ট হয়েছে এবং অনেকে বাস্তুহারা হয়ে পড়েছেন। এই ভুল সংশোধন করে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থার পতিত জমি ব্যবহারের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে সোলার প্যানেলের নিচেই সবজি চাষের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যা জমির বহুমুখী ব্যবহার নিশ্চিত করবে।
সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ বিভ্রাটের বিষয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, বিদ্যুৎ সংকটের একটি বড় অংশ মূলত কারিগরি (টেকনিক্যাল) ত্রুটির কারণে ঘটছে। অনেক এলাকায় বিতরণ লাইনের ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত লোড পড়ার কারণে সাব-স্টেশন বা গ্রিড ট্রিপ করছে। কিছুদিন পূর্বে দুটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে কারিগরি সমস্যার কারণে লোডশেডিং হয়েছিল। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিয়মিত তদারকির অভাবকে এই সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করে তিনি জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ (মেনটেইন্যান্স) করা হচ্ছে কি-না, তা সরজমিনে পরিদর্শন করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের একটি উচ্চপর্যায়ের কারিগরি টিম গঠন করা হয়েছে। বিতরণ লাইনের সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সংস্কারের কাজ শুরু হলেও টেকসই সমাধানের জন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন হবে।
পূর্ববর্তী সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, অতীতে রাষ্ট্রের প্রকৃত প্রয়োজন বিবেচনা না করে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল ও স্মার্ট মিটার প্রকল্পের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, আড়াই লাখ স্মার্ট মিটার কেনা হলেও মাঠপর্যায়ে মাত্র ৬৭টি স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে, যা সম্পদ ও পরিকল্পনার অপচয়। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা ও রেশনিং ব্যবস্থার সময় জনসাধারণের অতিরিক্ত চাহিদার (প্যানিক বায়িং) কারণে দেশকে আড়াই বিলিয়ন ডলার বাড়তি খরচ করতে হয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার বর্তমানে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তত তিন মাসের জ্বালানি তেল মজুত রাখার সক্ষমতা তৈরিতে কাজ করছে।
নাগরিক সংলাপে ক্যাবের পক্ষ থেকে জ্বালানি খাতের টেকসই উন্নয়নে ১৮ দফা সুপারিশমালা পেশ করা হয়। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা ড. শামসুল আলম। জনস্বার্থ ও জনগণের মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করে মন্ত্রী আশ্বস্ত করেন যে, নাগরিক সমাজ উত্থাপিত এই সুপারিশগুলো পর্যালোচনা করে জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্রে প্রচ্ছন্নভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।


