কূটনৈতিক ডেস্ক
বাংলাদেশ ও তাজিকিস্তানের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও শক্তিশালী এবং বহুমুখী করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্য, বিনিয়োগ, বিমান যোগাযোগ ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়াতে দুই দেশ বেশ কিছু দ্বিপক্ষীয় চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে একমত হয়েছে।
গত বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে নিজ কার্যালয়ে সফররত তাজিকিস্তানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইদিবেক কালান্দারের সঙ্গে এক সৌজন্য সাক্ষাৎকালে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এই গুরুত্বারোপ করেন। ঢাকায় দুই দেশের মধ্যে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠক (ফরেন অফিস কনসালটেশন-এফওসি) উপলক্ষে তাজিকিস্তানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী বর্তমানে বাংলাদেশ সফর করছেন। এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়।
বৈঠকে তাজিকিস্তানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইদিবেক কালান্দার দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং বিভিন্ন চুক্তিভিত্তিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে উভয় পক্ষ বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সংস্কৃতি, কূটনৈতিক ও সরকারি পাসপোর্টধারীদের জন্য ভিসা অব্যাহতি, পর্যটন খাতের উন্নয়ন, দ্বৈত কর পরিহার, বিনিয়োগের সুরক্ষা ও প্রসার এবং শিল্পখাতে সহযোগিতাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্রুত দ্বিপক্ষীয় চুক্তি চূড়ান্ত করার বিষয়ে একমত প্রকাশ করেছে। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, এই চুক্তিগুলো সম্পাদিত হলে দুই দেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে যোগাযোগের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ ও তাজিকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণকে ‘খুবই সীমিত’ উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান বলেন, দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে হলে বেসরকারি খাতের সম্পৃক্ততা বাড়ানো অপরিহার্য। তিনি দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দলের পারস্পরিক সফরের ওপর বিশেষ জোর দেন।
বাণিজ্যিক সম্পর্ক সহজীকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বাধা দূর করার লক্ষ্যে দুই দেশের শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন ও চেম্বারগুলোর মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সাথে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিষয়ক যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপকে (জেডব্লিউজি) পুনরায় সক্রিয় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা দুই দেশের অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পরিধি বাড়াতে উভয় দেশ নিজ নিজ রাজধানীতে আবাসিক দূতাবাস স্থাপন, সরাসরি বিমান চলাচল চালু এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজীকরণের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছে। এই উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে পণ্য, শ্রম ও সেবার নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত হবে এবং জনগণের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ (পিপল-টু-পিপল কন্টাক্ট) উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি, উভয় দেশের রপ্তানি পণ্যের বাজার পরিচিতি বাড়াতে ও বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি করতে দুই পক্ষই ইতিবাচক মনোভাব দেখিয়েছে।
সংসদীয় কূটনীতি জোরদারের অংশ হিসেবে বৈঠকে ‘বাংলাদেশ-তাজিকিস্তান পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ গ্রুপ’ গঠনের প্রস্তাবকে স্বাগত জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, এই উদ্যোগ দুই দেশের সংসদ সদস্যদের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।
বহুপাক্ষিক ফোরামে সহযোগিতার ক্ষেত্রে, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতায় সমর্থন দেওয়ায় তাজিকিস্তানকে ধন্যবাদ জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। দুই দেশ জাতিসংঘ, ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে একে অপরকে পারস্পরিক সমর্থন বজায় রাখার বিষয়ে পুনরায় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে। এছাড়া, দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার কৌশলগত গুরুত্ব বিবেচনায় রেখে আন্তঃআঞ্চলিক সংযোগ (কানেক্টিভিটি) সম্প্রসারণ নিয়েও দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদি আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে প্রভাব বাড়াতে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সদস্যপদ লাভে বাংলাদেশের যে আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, তার প্রতি তাজিকিস্তান ইতিবাচক সমর্থনের আশ্বাস দিয়েছে।


