ক্রীড়া ডেস্ক
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচকে আরও আকর্ষণীয় ও স্মরণীয় করে রাখতে এক অভূতপূর্ব উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা। টুর্নামেন্টের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ফাইনাল ম্যাচের মধ্যবর্তী বিরতিতে বা হাফটাইমে আমেরিকার বিখ্যাত ‘সুপার বোল’-এর আদলে একটি বিশেষ কনসার্ট বা ‘হাফটাইম শো’ আয়োজিত হতে যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিনোদন জগতের শীর্ষ তারকাদের অংশগ্রহণে এই তারকাখচিত আয়োজন শুধু মাঠের ফুটবল লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং তা বিশ্বসংগীতের এক ঐতিহাসিক মিলনমেলায় পরিণত হবে।
আগামী ১৯ জুলাই অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপ ফাইনালের প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার পর ১১ মিনিটের একটি বিশেষ হাফটাইম শো অনুষ্ঠিত হবে। এই সংক্ষিপ্ত সময়ে বিশ্বমঞ্চে একসঙ্গে সুরের জাদু ছড়াবেন কলম্বিয়ান পপ তারকা শাকিরা, কানাডিয়ান গায়ক জাস্টিন বিবার, পপ সম্রাজ্ঞী ম্যাডোনা এবং দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্বখ্যাত বয়ব্যান্ড বিটিএস (BTS)। বিশ্বসংগীতের এই চার পরাশক্তিকে একই মঞ্চে নিয়ে আসার ঘটনা বিনোদন ও ক্রীড়া ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ফিফার এই বিশেষ হাফটাইম শোর নেপথ্যে রয়েছে একটি মানবিক ও মহৎ উদ্দেশ্য। বিশ্বজুড়ে শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে গঠিত ‘ফিফা গ্লোবাল সিটিজেন শিক্ষা তহবিল’-এর জন্য অর্থ সংগ্রহ করাই এই মেগা ইভেন্টের প্রধান লক্ষ্য। অনুষ্ঠানটি থেকে প্রাপ্ত অর্থ সরাসরি এই তহবিলে যুক্ত হবে, যার মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার উন্নয়নে ১০ কোটি মার্কিন ডলার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মহতি এই আয়োজনের সৃজনশীল পরিকল্পনার (ক্রিয়েটিভ ডিরেকশন) দায়িত্বে রয়েছেন ব্রিটিশ রক ব্যান্ড কোল্ডপ্লের (Coldplay) প্রধান গায়ক ক্রিস মার্টিন। মূল তারকাদের পাশাপাশি এই আয়োজনে আরও অংশ নেবেন নাইজেরিয়ার জনপ্রিয় আফ্রোবিট শিল্পী বার্না বয়, ভেনেজুয়েলার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সুরকার ও লস অ্যাঞ্জেলেস ফিলহারমোনিকের অর্কেস্ট্রা পরিচালক গুস্তাভো দুদামেল। এছাড়া কোল্ডপ্লের সদস্যদের নিয়ে গঠিত ‘পিএস বাইশ কোরাস’ এবং শিশুদের জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘সিসেমি স্ট্রিট’-এর মাপেট চরিত্রগুলোও এই মঞ্চে হাজির থাকবে।
এই ঐতিহাসিক আয়োজনে যুক্ত হওয়া প্রসঙ্গে পপ তারকা জাস্টিন বিবার নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে জানিয়েছেন, ফিফা বিশ্বকাপ এমন একটি বিশ্বজনীন আয়োজন, যা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে পুরো বিশ্বকে একক সুতোয় বাঁধতে পারে। অন্য কোনো ক্রীড়া বা সাংস্কৃতিক উৎসবের এমন সর্বজনীন ক্ষমতা নেই। উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন গুরুতর স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভোগার কারণে নিজের ‘জাস্টিস’ বিশ্ব সফর বাতিল করতে বাধ্য হয়েছিলেন বিবার। তবে চলতি বছরের বসন্তে ক্যালিফোর্নিয়ার কোচেলা সংগীত উৎসবে পারফর্ম করার মাধ্যমে তিনি মঞ্চে সফল প্রত্যাবর্তন করেন। চার বছর পর সেটিই ছিল তার প্রথম বড় কোনো লাইভ পারফরম্যান্স, যার ধারাবাহিকতায় এবার তিনি বিশ্বকাপের ফাইনাল মঞ্চ মাতাতে চলেছেন।
এর আগে ২০২৬ বিশ্বকাপের জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও একসঙ্গে পারফর্ম করেছিলেন শাকিরা এবং বার্না বয়। তাদের পরিবেশিত বিশ্বকাপের অফিশিয়াল থিম গান ‘দাই দাই’ টুর্নামেন্ট শুরুর পর থেকেই বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচ চলাকালীন স্টেডিয়ামগুলোতে এই গানটি নিয়মিত বাজানো হচ্ছে, যা ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে দারুণ উদ্দীপনা তৈরি করেছে।
এদিকে বিনোদন জগতের এই মহোৎসবের সমান্তরালে মাঠের মূল লড়াইও এখন চূড়ান্ত রূপ নিতে যাচ্ছে। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্ব ও নকআউট পর্বের রুদ্ধশ্বাস বাধা পেরিয়ে শীর্ষ আটটি দল জায়গা করে নিয়েছে কোয়ার্টার ফাইনালে। সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের পরাশক্তিরা। শেষ আটের প্রথম ম্যাচে গতবারের রানার্সআপ ফ্রান্সের মুখোমুখি হবে আফ্রিকার শক্তিশালী দল মরক্কো। অন্য ম্যাচগুলোতে স্পেন লড়বে বেলজিয়ামের বিরুদ্ধে, নরওয়ের মুখোমুখি হবে ইংল্যান্ড এবং বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা খেলবে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে।
মাঠের এই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইও জমে উঠেছে। গোলদাতার তালিকায় এখন পর্যন্ত শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ও কিংবদন্তি ফুটবলার লিওনেল মেসি। চলতি টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত তার গোল সংখ্যা আটটি। তাকে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে যৌথভাবে অবস্থান করছেন ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপে এবং নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড, দুজনেরই সংগ্রহ সাতটি করে গোল। অন্যদিকে ছয়টি গোল নিয়ে এই দৌড়ে বেশ ভালোভাবেই টিকে আছেন ইংল্যান্ডের অধিনায়ক হ্যারি কেইন।
ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, মাঠের ভেতরে ফুটবলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই আর মাঠের বাইরে বিশ্বসংগীতের এই জমকালো আয়োজন—দুইয়ের সংমিশ্রণে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল ও দর্শনীয় একটি অধ্যায় হিসেবে দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।


