আফগানিস্তানে জাতিসংঘের নতুন মিশন প্রধান রাবাব ফাতিমা

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের নতুন মিশন প্রধান রাবাব ফাতিমা

 আন্তর্জাতিক ডেস্ক

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস আফগানিস্তানে জাতিসংঘের সহায়তা মিশন—ইউএনএএমএ (UNAMA)-এর নতুন প্রধান হিসেবে বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক রাবাব ফাতিমাকে নিয়োগ দিয়েছেন। গত বুধবার জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা ঘোষণা করা হয়। এই নিয়োগের মধ্য দিয়ে আফগানিস্তানে জাতিসংঘের জটিল ও স্পর্শকাতর মিশনে প্রথমবারের মতো একজন বাংলাদেশি কূটনীতিক প্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে যাচ্ছেন।

রাবাব ফাতিমা বর্তমান দায়িত্ব নেওয়ার আগে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বর্তমানে স্বল্পোন্নত দেশ, স্থলবেষ্টিত উন্নয়নশীল দেশ এবং ক্ষুদ্র উন্নয়নশীল রাষ্ট্রবিষয়ক জাতিসংঘের উচ্চ প্রতিনিধি (UN-OHRLLS) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। আন্তর্জাতিক কূটনীতির আঙিনায় তার সুদীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং বিচক্ষণতা এই নিয়োগের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

জাতিসংঘ মহাসচিবের মুখপাত্রের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে রাবাব ফাতিমার কর্মজীবনের বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়েছে, রাবাব ফাতিমার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সরকারি দায়িত্ব পালনের ৩০ বছরেরও বেশি সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার এই দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি দ্বিপক্ষীয় ও বহুপক্ষীয় কূটনীতি, নীতিনির্ধারণ, অ্যাডভোকেসি এবং উন্নয়নমূলক কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বিশেষ অবদান রেখেছেন। জটিল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তার এই দক্ষতা আফগানিস্তানের বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

রাবাব ফাতিমা এই মিশনে কানাডার জর্জেট গ্যাগননের স্থলাভিষিক্ত হবেন। উল্লেখ্য, গ্যাগনন এত দিন ইউএনএএমএ-এর উপ-বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং একই সঙ্গে মিশনপ্রধানের অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন।

আফগানিস্তানে জাতিসংঘের এই মিশনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০২ সালে আফগানিস্তানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও শান্তি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ইউএনএএমএ প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২১ সালের আগস্ট মাসে তালেবান ক্ষমতা গ্রহণের পর আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও মানবাধিকার পরিস্থিতির নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দেশটিতে মানবিক সহায়তা প্রদান, তালেবান প্রশাসনের সঙ্গে রাজনৈতিক সংলাপ বজায় রাখা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার ক্ষেত্রে ইউএনএএমএ বিশ্ব সম্প্রদায়ের অন্যতম ভরসার জায়গা হিসেবে কাজ করে আসছে।

বর্তমানে আফগানিস্তানের সামগ্রিক পরিস্থিতি অত্যন্ত ভঙ্গুর। একদিকে চরম মানবিক সংকট, অন্যদিকে তালেবান সরকারের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সম্পর্কের টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে জাতিসংঘ মিশনকে প্রতিনিয়ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বিশেষ করে, মিশনের লক্ষ্য ও কার্যপদ্ধতি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ভিন্ন ভিন্ন মত রয়েছে। এমনকি নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও মিশনের ভূমিকা নিয়ে মতপার্থক্য লক্ষ্য করা গেছে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ মিশনের কার্যপদ্ধতি নিয়ে কিছুটা আপত্তি জানালেও, আফগানিস্তানে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার স্বার্থে গত জুনে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মতভাবে ইউএনএএমএ-এর মেয়াদ আরও এক বছরের জন্য নবায়ন করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে রাবাব ফাতিমার নিয়োগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন দক্ষ কূটনীতিক হিসেবে তিনি কীভাবে আফগানিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে জাতিসংঘের মানবিক ও উন্নয়নমূলক কর্মসূচিগুলো এগিয়ে নেবেন, সেদিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর থাকবে। একই সঙ্গে, আফগানিস্তানের জনগণের অধিকার রক্ষা এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি কতটা ভূমিকা রাখতে পারেন, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে কৌতুহল রয়েছে। তার দীর্ঘ কূটনৈতিক ক্যারিয়ারের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আফগানিস্তানের চলমান সংকটের টেকসই সমাধানে নতুন আশার সঞ্চার করবে বলে আশা করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

জাতীয় শীর্ষ সংবাদ